শেখ হাসিনা: ক্রমেই নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছেন

0 Shares

৭৫ পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার জন্যে রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় সং’কটটকাল সময় ছিল ওয়ান ইলেভেন। সেই সময় শেখ হাসিনার প্রতি বিশ্বস্ততার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন প্রয়াত জিল্লুর রহমান এবং সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।

রাজনীতিতে ঘরের ভেতর শ’ত্রু থাকে এবং তাদের মোকাবেলার জন্য লাগে আদর্শবাদী, বিশ্বস্ত সহযো’দ্ধা। প্রয়াত জিল্লুর রহমান এবং সৈয়দ আশরাফ ছিলেন তেমন সহচর। যারা ওয়ান ইলেভেনের মাইনাস ফর্মুলার ষড়’যন্ত্র থেকে শেখ হাসিনাকে রক্ষায় সহযোগিতা করেছিলেন, বিপদ আপদ সব কিছু তুচ্ছ করে দল এবং দলীয় প্রধানের প্রতি অনুগত ছিলেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব দলে পুনঃ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। আর সেই আস্থার প্রতিদানে ৭৫ পরবর্তী সময়ে সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রয়াত জিল্লুর রহমানকে রাষ্ট্রপতির পদে বসান। জিল্লুর রহমান কেবল একজন আওয়ামী লীগের নেতা বা রাষ্ট্রপতিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন শেখ হাসিনার একজন অভিভাবকের মতো। শেখ হাসিনা যে কোন দুঃসময়ে পরামর্শের জন্য তার সহযোগিতা চাইতেন। শেখ হাসিনা জানতেন, নির্মোহ, ভালো ও সৎ পরামর্শ তিনি পাবেন। যা সকল স্বার্থের উর্ধ্বে। জিল্লুর রহমান চলে গেছেন, শেখ হাসিনাও যেন একজন অভিভাবককে হারিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের আরেক প্রয়াত নেতা সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন শেখ হাসিনার ভাইয়ের মতো। প্রতিকূল রাজনীতির সময়ে শেখ হাসিনার পাশে থেকে তাঁকে সাহায্য-সহযোগিতা করা, বিশ্বস্তভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সৈয়দ আশরাফ ছিলেন শেখ হাসিনার বিশ্বাসের জায়গা। সং’কটকালে যে সৈয়দ আশরাফ জ্বলে উঠতে পারতেন, তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল হেফাজতের ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচীর সময়ে। রাজনৈতিক নেতাদের অমরত্বপ্রাপ্তির জন্য একটি কর্মই যথেষ্ট। সেই ৫ মে তারিখে হেফাজতের শো-ডাউনের দিন সৈয়দ আশরাফ প্রমাণ করেছিলেন, নেতৃত্ব কাকে বলে। সেই চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং আত্মবিশ্বাস তাকে দিয়েছে অমরত্ব। সৈয়দ আশরাফও চলে গেলেন।

শেখ হাসিনা এভাবে ক্রমশ নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছেন। জাতীয় চার নেতার অন্যতম সন্তান মোহাম্মদ নাসিম ছিলেন শেখ হাসিনার আরেকজন বিশ্বস্ত সহচর। বিশেষ করে স্বৈ’রাচারবিরো’ধী আন্দোলনে শেখ হাসিনার পাশে থেকে তিনি তাঁকে সাহস জুগিয়েছেন, শেখ হাসিনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ল’ড়াই করেছেন, সংগ্রাম করেছেন। জাতীয় চার নেতার সন্তানদের প্রতি শেখ হাসিনার আলাদা ভালোবাসা, মমত্ববোধ ছিল, আছে এবং থাকবে। মোহাম্মদ নাসিম চলে যাওয়ার পর শেখ হাসিনা যেন তাঁর কাছের আরেকজন মানুষকে হারালেন, যার হাতে তিনি ছেড়ে দিয়েছিলেন প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির ঐক্যের দায়িত্ব।

শেখ আবদুল্লাহ যতদিন ছিলেন ততদিন গোপালগঞ্জ নিয়ে শেখ হাসিনাকে কিছু ভাবতে হতো না। গোপালগঞ্জের মানুষের সব ধরণের সমস্যা, বিয়ে থেকে শুরু করে জমি নিয়ে বিরো’ধ, চাকরি থেকে শুরু করে অসুখ-বিসুখ সব কিছুর জন্যে শেখ আবদুল্লাহই যথেষ্ট ছিলেন। তাই তাঁর হাতে গোপালগঞ্জের দায়িত্ব ছেড়ে অনেকটাই নির্ভার থাকতেন শেখ হাসিনা। শেখ আবদুল্লাহও বিদায় নিলেন।

এখন শেখ হাসিনা রাজনীতিতে আরেকটু নিঃসঙ্গতা বোধ করছেন। শেখ হাসিনার ঘরে বাইরের ষড়’যন্ত্র এবং শ’ত্রু মোকাবেলা করেই রাজনীতি করতে হয়েছে জীবনভর। অনেক বড় নেতা আছেন, তবে তাঁদের বিশ্বস্ততা এবং প্রতিকূল সময়ে শেখ হাসিনাকে তাঁরা সহযোগিতা করবেন কি না এই নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। এই প্রশ্নের ভিড়েও শেখ হাসিনার আশেপাশে যে বিশ্বস্ত মানুষগুলো ছিল, সং’কটে তিনি যাদের দিকে তাকাতে পারতেন, যাদের সাথে তিনি সবকিছু নিয়ে কথা বলতে পারতেন- তেমন মানুষগুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। যারা আছেন তারাও এখন অসুস্থ, নানা রোগশোকে ভুগছেন।

সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এখন পরামর্শ দেওয়ার পর্যায়ে নেই, সাহারা খাতুন অসুস্থ, বেগম মতিয়া চৌধুরীও আগের অবস্থানে নেই। সবকিছু মিলিয়ে শেখ হাসিনার পাশে বিশ্বস্ত, রাজনীতি বোঝা, দুঃসময়ে পাশে থাকা মানুষের সংখ্যা ক্রমশ কমে যাচ্ছে, ক্রমেই তিনি যেন নিঃসঙ্গ হয়ে যাচ্ছেন। এই নিঃসঙ্গতা একজন রাজনীতিবিদের জন্য অনেক কঠিন পরীক্ষা।

বাংলাইনসাইডার

0 Shares