সরকারি চাকুরিজীবীরা কি সকল আইনের উর্ধ্বে?

0 Shares

সাম্প্রতিক সময়ে জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে অত্যন্ত সোচ্চার হয়েছে সরকার। রিজেন্ট হাসপাতালের অভিযোগের প্রেক্ষিতে জালিয়াত সাহেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, জেকেজির আরিফুল হক চৌধুরী ও ডা. সাবরিনাকে ধরা হয়েছে। দুদক স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতির শিরোমনি মিঠুকে তলব করেছে। এরকম দৃশ্যমান কিছু দুর্নীতি এবং জালিয়াতি বিরো’ধী অভিযান জনমনে আশার সঞ্চার করেছে।

বিশেষ করে র‍্যাব অভিযান চালিয়ে জালিয়াতির যেসব চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করছে, তাতে জনগণ কিছুটা হলেও আশান্বিত হচ্ছে। আস্থার জায়গা ফিরে পাচ্ছে। কিন্তু এই দুর্নীতি-জালিয়াতি বিরো’ধী অভিযানে একটি অংশ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তারা হলো সরকারি চাকুরেরা।

এটা শুধু এখন নয়, বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে, একদম নিম্ন স্তরের চাকুরে থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের চাকুরেরা কখনোই দুর্নীতি, জালিয়াতি বা অ’নিয়মের দায়ে অভিযুক্ত হন না। তারা আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে পার পেয়ে যান। অথচ সরকারি খাতে যে কোনো অ’নিয়ম, জালিয়াতি, দুর্নীতি সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যেক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া অ’সম্ভব ব্যাপার।

স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতির অন্যতম গডফাদার আবজাল, তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিম্নশ্রেনীর একজন কর্মকর্তা ছিলেন। অথচ তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পালিয়ে গেছেন। এখন তিনি বিচারের আওতা বহির্ভূত। সদ্য বিদায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ সবগুলো অ’নিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন এবং সবগুলো অ’নিয়মের কোনো দায়দায়িত্ব তিনি কোনভাবেই এড়াতে পারবেন না। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাবেক এই মহাপরিচালকের বিরু’দ্ধে কোন আইনত পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

অথচ রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে তিনি কেবল চুক্তিই করেননি, তিনি ঐ হাসপাতালকে সরকারি জিনিসপত্র নিয়ম ভ’ঙ্গ করেছেন, জেকেজি’কে নমুনা পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছেন। মিঠু সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটাতে সাবেক এই মহাপরিচালকের ভূমিকা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেই মুখরোচক আলোচনা হতো সবসময়। অথচ এই ঘটনায় তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে।

রিজেন্টের মালিক জালিয়াত সাহেদকে গ্রেপ্তারের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এবং পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হলে তার উত্তরে তিনি বলেন, সাবেক সচিব আসাদুল ইসলামের মৌখিক নির্দেশেই তিনি রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তি করেন। রিজেন্টের মালিক জালিয়াত সাহেদকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখন পর্যন্ত এই আসাদুল ইসলাম কেন মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন, কার দ্বারা প্ররোচিত হয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন সে ব্যাপারে কোন তথ্য জনগণের কাছে আসেনি।

কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সাবেক এই সচিব পদোন্নতি পেয়ে এখন পরিকল্পনা কমিশনে আছেন। অথচ করোনায় যে ব্যর্থতা সেই ব্যর্থতার দায় তিনি কোনভাবেই এড়াতে পারেন না। একইভাবে সাহেদ প্রশাসনের কিছু সাবেক কর্মকর্তার নাম গণমাধ্যমে চাউর হয়েছে। অথচ তাদেরকেও এখন পর্যন্ত জেরায়র আওতায় আনা বা তারা কীভাবে সাহেদকে পৃষ্ঠপোষকতা দিলেন, সাহেদ কীভাবে নিয়মিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেত এই সমস্ত বিষয় নিয়ে মোটেও কথাবার্তা হচ্ছে না।

আমরা দেখি, দুর্নীতি বিরো’ধী অভিযান যখন হয়, তখন কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ধরা হয়। এর আগে আমরা দেখেছি, জি কে শামীমকে যখন গ্রেপ্তার করা হলো তখন তাকে যারা পৃষ্ঠপোষকতা দিতো, যাদের মাধ্যমে জি কে শামীম টেন্ডার মাফিয়া হয়ে উঠেছিল তাদের বিরু’দ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, দুর্নীতি, জালিয়াতি বন্ধ করতে হলে এর উৎসে যেতে হবে। এসব ঘটনা সরকারের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মদদ এবং পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া অ’সম্ভব। তাই যারা এই ধরণের ঘটনাগুলো আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছেন, যারা লাভবান হচ্ছেন তারা কেন আইনের উর্ধ্বে থাকবেন সেই প্রশ্ন জনগণের মধ্যে উঠছে।

বাংলাইনসাইডার

0 Shares