বৈরুতে যেন ‘কেয়ামত’ নেমে এসেছিল

0 Shares

লেবাননের প্রধান সমুদ্র বন্দরে বিস্ফোরক দ্রব্যের গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণে রাজধানী বৈরুতের অর্ধেকই ধুলিস্যাৎ হয়েছে। ১৩৫ জন নিহত ও পাঁচ হাজারের বেশি আহত হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছে একশ’র বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তুপে তাদের খোঁজ করছে উদ্ধারকারীরা। ফলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দু’সপ্তাহের জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) বিকেলে বৈরুতের বন্দর এলাকায় বিস্ফোরণটি ঘটে। এর তীব্রতা এতটাই ছিল যে গোটা শহরই ভূমিকম্পের মত কেঁপে ওঠে। বহুদূর পর্যন্ত বাড়িঘর ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি এর কম্পন অনুভূত হয় ২৪০ কিলোমিটার দূরের দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসেও। অনেকেই মনে করেছিলেন ভূমিকম্প হয়েছে।

লন্ডভন্ড হয়েছে পুরো শহর। ঘরহারা হয়েছে অন্তত ৩ লাখ মানুষ। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় তাদের কাছে এ যেনো এক নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞ। বিস্ফোরণের সেই ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে বৈরুতের মার মিখায়েল এলাকার বাসিন্দাদের কথায়।

‘যেন কেয়ামত নেমে এসেছিল’

বৈরুতের মার মিখায়েল এলাকার বাসিন্দা আলি জাকারির ভাষ্য, “প্রকাণ্ড একটা শব্দ, কোনও কিছুর আঘাত লাগল। মুহূর্তের জন্য জ্ঞান হারাই, আধামিনিট, একমিনিট… মনে হচ্ছিল, যেন দোযখ নেমে এসেছিল।”

তিনি বলেন, “চারদিকে মানুষজনের চিৎকার, চেঁচামেচি, আমরা চারিদিকে ছিটকে পড়ছিলাম, আগুনের ফুলকি উড়ছিল।”

ওই এলাকার আরেক বাসিন্দা তার অভিজ্ঞতার বর্ণনায় বলেন, “আমি কাজে যাচ্ছিলাম, বসতে যাওয়া মাত্রই পুরো অফিস আমার মাথার ওপরে এসে পড়ল।”

তিনি যোগ করে বলেন, “আমি কিছুই শুনতে পাচ্ছিলাম না, সেটা বিস্ফোরণ না কী ছিল তা আমি জানিনা…কেবল বুঝতে পেরেছি, আমি উড়ে গিয়ে ধ্বংসস্তুপের নিচে পড়েছি।”

আলি ইরানি নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “আমি প্রায় ৫শ’ মিটার দূরে মহাসড়কে ছিলাম। বিস্ফোরণের ধাক্কায় আমার গাড়ি প্রায় ৫ মিটার দূরে গিয়ে পড়ে। উড়ে যায় জানালা।”

‘মনে হচ্ছিল ভাঙা কাচের ঘূর্ণিঝড়’

বৈরুতে অবস্থান করা ‘নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পত্রিকার এক সাংবাদিক বিবিসি রেডিও ফাইভে এসে লাইভে বলেছেন, জানালার ভাঙা কাচের ঘূর্ণিঝড়ে পড়েছিলেন তিনি… এরপরই তিনি দেখেন বাড়ি ভেঙে পড়ছে। আশেপাশের বাড়িঘরও ভেঙে চুরমার হয়েছে।

বিবিসি’কে আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের শব্দে কিছুক্ষণের জন্য তার কানে তালা লেগে গিয়েছিল। বুঝতে পেরেছিলেন কিছু একটা ঘটেছে। আর তারপরই আশেপাশের দোকান, বাড়িঘর সবকিছু থেকে বৃষ্টির মতো কাচ ভেঙে পড়তে দেখেন তিনি।

হাসপাতালেও ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা

প্রকাণ্ড বিস্ফোরণে হাসপাতালও টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন এক চিকিৎসক। তিনি জানান, তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালের গাড়ি পার্কিং এলাকাতেই লোকজনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হয়েছে।

ওই চিকিৎসক বলছিলেন, “মানুষজন আতঙ্কিত ছিল। হাসপাতালের অনেক কর্মচারীও মারাত্মক আহত হয়েছিল। তারপরও তাদেরকে আইসিইউ তে থাকা রোগীদের দেখভাল করতে হয়েছে।”

হাসপাতালের বিপর্যয়কর অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন বৈরুতের এক বাসিন্দাও। হাসপাতালের মাটিতে ১শ’ থেকে দেড়শ মানুষকে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি।

তার কথায়, “চারিদিকে রক্ত, লোকজন আর্তনাদ করছে। এরকম দৃশ্য জীবনে কখনও দেখিনি। যেনো মনে হচ্ছিল এক হলিউডি সিনেমার দৃশ্য। কিন্তু দুঃখজনক, এমনটি সত্যিই ঘটেছে।”

শত শত কোটি ডলারের ক্ষয়ক্ষতি

লেবাননের অর্থমন্ত্রী বৈরুতের বন্দর নগরীর বিস্ফোরণকে ‘বিপর্যয়কর’ আখ্যা দিয়েছেন। এতে শতশত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা প্রকাশ করেছেন তিনি।

বিস্ফোরণের জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনারও অঙ্গীকার করেছেন মন্ত্রী। বিবিসিকে তিনি বলেন, “এমন একটি বাড়ি নেই, দোকান নেই, এপার্টমেন্ট নেই যেটা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি”।

তিনি বলেন, “এ বিস্ফোরণ আসলেই বিপর্যয়কর। বন্দরের আশেপাশে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। বিস্ফোরণ যেখানে ঘটেছে সেখানে আসলে সবকিছুই সাগরের নিচে চলে গেছে।”

“একখন্ড ভূমি ছিল। সেটা এখন সাগরে চলে গেছে, পুরোই অদৃশ্য হয়ে গেছে। আমাদের শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে বলছি। তবে আসলেই কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা এখনও আমরা জানিনা”, যোগ করেন তিনি।

বৈরুতের গভর্নর মারওয়ান আবৌদ তিন লাখ মানুষের গৃহহীন হয়ে পড়ার কথা জানিয়েছেন। ৩শ’ কোটি থেকে ৫শ’ কোটি ডলারের মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকতে পারে বলে জানান তিনি।

প্রিয়জনদের খুঁজছে মানুষ

শহরের কয়েকটি ছবিতে রাস্তার পর রাস্তা ধ্বংস হয়ে যেতে দেখা গেছে। মানুষের বাড়িঘরেরও একই দশা। এ বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে প্রিয়জনদের খুঁজে ফিরছে মানুষ।

ধ্বংসস্তুপের মধ্যে উদ্ধারকারীরা মৃত এবং জীবিতদের সন্ধান করছে। পাশাপাশি অনলাইনেও নিখোঁজদের অনুসন্ধানে নেমেছে মানুষ। এরই মধ্যে ‘লোকেটিং ভিক্টিমস বৈরুত’ ইন্সটাগ্রাম একাউন্টের অনুসারী হয়েছে ৮০ হাজার মানুষ।

বিস্ফোরণের পর থেকে যাদের খোঁজ মিলছে না তাদের সন্ধান পেতে সহায়তা চেয়ে অনুরোধ করা হচ্ছে এই একাউন্টে।

পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন দেশ

লেবাননের জনগণের জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউ’র ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিশনার বৈরুতে উদ্ধারকাজের জন্য ১শ’র বেশি উচ্চপ্রশিক্ষিত দমকলকর্মী এবং গাড়িসহ, কুকুর ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি পাঠানো হবে বলে জানিয়েছেন।

ফ্রান্স উদ্ধারকারীসহ তিনটি বিমান, চিকিৎসা সরঞ্জাম বৈরুতে পাঠানোসহ মোবাইল ক্লিনিকের ব্যবস্থা করছে। নেদারল্যান্ডস, গ্রিস, এবং চেক রিপাবলিকও বৈরুতের সহায়তায় পাশে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছে।

ওদিকে, ইরান বৈরুতে ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি চিকিৎসক দল পাঠানোর কথা জানিয়েছে। কাতার, ইরাক এবং কুয়েতও বৈরুতে সাহায্য পাঠানোর আশ্বাস দিয়েছে।

বিস্ফোরণকে ঘিরে উঠছে নানা প্রশ্ন, ছড়িয়েছে গুজব :

বৈরুতে ভয়াবহ বিস্ফোরণের পরপরই এর কারণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়েছে। বন্দরের একটি অনিরাপদ গুদামে হাজার হাজার টন এমোনিয়াম নাইট্রেটকে বিস্ফোরণের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কিন্তু স্যেশাল মিডিয়ার ফুটেজ থেকে বিস্ফোরণটি প্রথমে আতশবাজির কারখানার আগুন থেকে ঘটেছে কিংবা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ে।

স্যোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে ছোট ছোট কিছু বিস্ফোরণ এবং প্রাথমিকভাবে লাগা আগুন থেকে বড় একটি বিস্ফোরণ দেখা যাওয়ায় এটি আতশবাজির কারাখানা থেকে ঘটেছে বলে ধারণা ছড়িয়ে পড়েছিল।

পরে আরও কয়েকটি ফুটেজে গম্বুজ আকারের সাদা ধোয়াঁর কুন্ডলি দেখা যাওয়ার পর তা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ বলে গুজব ছড়ায়। এ বিস্ফোরণ ইসরায়েল, হিজবুল্লাহ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের ‘পারমাণবিক হামলা’ বলেও চাউর হয় স্যোশাল মিডিয়ায়।

যদিও অস্ত্র বিশেষজ্ঞরা সঙ্গে সঙ্গেই এমন গুজব নাকচ করে বলেছেন, পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটলে চোখ ধাঁধানো সাদা আলোর ঝলকানি দেখা যেত; আর এর উত্তাপ এতটাই হত যে, লোকজন মারাত্মকভাবে পুড়ে যেত।

বিস্ফোরণটি নিয়ে যে কেবল এমন গুজব ছড়িয়েছে তাই নয়, বৈরুতের বাসিন্দারা এমন একটি ঘটনা কেন ঘটল তা নিয়ে নানা প্রশ্নও তুলেছেন।

গত বছরের শেষ দিক থেকেই অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত লেবানন। তার ওপর করোনাভাইরাস মহামারীতে দেশটি নতুন করে স্বাস্থ্য সংকটেও পড়েছে। লেবাননিদের অনেকেই এখন মর্মান্তিক এই বিস্ফোরণের জন্য দেশের দুর্নীতিগস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন।

এমোনিয়াম নাইট্রেট ওই বন্দর এলাকায় ছিল তা কে জানত? সেখানে এই নাইট্রেট ছিল কেন? এটি কি কেবলই গাফিলতি কিংবা খামখেয়ালিপনা? নাকি কোনও ক্ষতিকর বা অসৎ উদ্দেশে সেটি রাখা ছিল?

এর সঙ্গে কি ঘুষ বা দুর্নীতির কোনও যোগ আছে? কোনও মানুষ কিংবা প্রতিষ্ঠান কি এই নাইট্রেটের কথা জানত? আর কোনওসময় এ বিস্ফোরক শক্তি কাজে আসতে পারে বলে একটি সময় পর্যন্ত তা রেখে দিয়েছিল?- এতসব প্রশ্নের উত্তরই এখন চায় লেবাননবাসী।

0 Shares