বিল দিতে না পারলে রোগীর জায়গা-সম্পত্তি লিখে নিতেন সাহেদ

0 Shares

মগবাজারের মধুবাগের ব্যবসায়ী মোখলেসুর রহমান। গত ১৮ জুন করোনা ভাইরাসে আক্রা’ন্ত হন তিনি। প্রথমে ভর্তি হন গুলশানের সাহাবউদ্দিন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। একদিন ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন। আর এ সময়ের জন্য তিনি বিল দিয়েছেন ৪৫ হাজার টাকা। পরে ভর্তি হন মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালে। ৮ দিন ছিলেন ওই হাসপাতালে। এ ক’দিন চিকিৎসার জন্য ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হয় মোখলেসুরকে। তারমধ্যে এক জোড়া গ্লাভসের দাম ধরা হয় ৩ হাজার ১৮৫ টাকা। অথচ বাজারে এ গ্লাভসের দাম তখন ছিল ৩০ টাকা। সার্জিক্যাল মাস্কের দাম ধরা হয় ৭০০ টাকা। কিন্তু এটির তখন বাজারদর ছিল ২০ টাকা।

শুধু মোখলেসুর রহমান একাই রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদের চিকিৎসা বাণিজ্যের শি’কার হননি। মনগড়া বিল ধরিয়ে দিয়ে মোখলেসুরের মতো আরও অনেক রোগীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সাহেদ। এমনকি কোনো রোগী রিজেন্টের মনগড়া বিল দিতে না পারলে তার বাড়ির জায়গা-সম্পত্তি সাহেদের নামে লিখে দেওয়ারও নজির রয়েছে। রিমান্ডে থাকা সাহেদ এবং তার সহযোগী রিজেন্ট গ্রুপের এমডি মাসুদ পারভেজ ও আইটি শাখার প্রধান তারেক শিবলী গোয়েন্দা পুলিশের জেরায় এ তথ্য জানিয়েছেন।

এদিকে করোনা পরীক্ষার ভুয়া সনদসহ বহুমাত্রিক জালিয়াতিতে আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের স্বত্বাধিকারী ও রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের ভোগ করা সব রাষ্ট্রীয় সুবিধা একে একে প্র’ত্যাহার করা হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় এবার স্থ’গিত করা হয়েছে তার জাতীয় পরিচয়পত্র। এর আগে বাতিল করা হয়েছে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড। এছাড়া সাহেদের পাসপোর্ট জ’ব্দ করে তা স্থ’গিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, সাহেদের বিরু’দ্ধে যেখানেই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাকে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সরকার তার বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করেছে।

পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে পাওয়া সাহেদের নিরাপত্তা পাস বাতিল করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাহেদ খুব চতুর ও ধুরন্ধর লোক। তার পক্ষে নিরাপত্তা পাস সংগ্রহ কোনো ব্যাপারই নয়। ইতিমধ্যে সচিবালয়ে প্রবেশের জন্য অ্যাক্রেডিটেশন পাস বাতিল করা হয়েছে। এনআইডিও স্থ’গিত করা হয়েছে। এসবির কোনো পাস তাকে দেওয়া হয়েছে কি না সেটা আমার জানা নেই। বিষয়টি সম্পর্কে আমি খোঁজ নেব।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলেছেন, জেরায় সাহেদ, মাসুদ পারভেজ ও তারেক শিবলী একে অন্যের দোষ চাপিয়ে দিচ্ছেন। তাদের মুখোমুখি করে কয়েক দফা জেরা করা হয়েছে। ৩ জনই ভ’য়ংকর জালিয়াত। তারা মিরপুর ও উত্তরায় রিজেন্ট হাসপাতালে রোগীদের ভর্তি করে ২ হাজার টাকার জায়গায় ১০ হাজার টাকা হাতিয়ে নিত। তাদের ঢাকাসহ সারা দেশে অন্তত একশর মতো দালাল ছিল। দালালরা রোগী ভাগিয়ে এনে হাসপাতালে আনার পর এসব অ’পকর্ম চালিয়ে আসছিল তারা। কোনো রোগী বা স্বজন হাসপাতালের বিল দিতে না পারলে বাড়ির জায়গা-সম্পত্তি সাহেদের নামে লিখে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

ব্যবসায়ী মোখলেসুর রহমানের মেয়ে সুরভী রহমান গতকাল বলেন, রিজেন্ট হাসপাতালটি ছিল একটি কসাইখানা। সেবার নামে তারা মানুষের অর্থ লোপাট করেছে। তারা রোগীদের মানুষ হিসেবে দেখে না। টাকা ছাড়া কিছু বুঝে না ওরা। যে কয়টা দিন হাসপাতালে ছিলাম, মনে হয়েছে দোজখখানায় ছিলাম। করোনা রোগীদের ফ্রি চিকিৎসা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা প্রতিটি রোগী ও তাদের স্বজনদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, একটি গ্লাভস ৩ হাজার ১৮৫ টাকা হতে পারে? তারা সেটি করেছে। কোথায় গেছে আমাদের চিকিৎসাসেবা! কোনো নজরদারি ছিল না। রিজেন্টের মালিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে এ কাজ করেছে। হাসপাতালের ভেতরে পরিবেশই ছিল না। নামেই ছিল আইসিও। পরীক্ষাগুলো ছিল পুরোপুরি নকল।

বাবলু রহমান নামে এক রোগীর স্বজন জানান, উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতালে বাবলু ভর্তি ছিলেন। দু’দিনের মাথায় তিনি মা’রা যান। এ সময়ে বিল ধরা হয় ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। এত টাকা কেন এ প্রশ্ন করলে হাসপাতালের লোকজন লা’শ আটকে রাখে। পরে গ্রামের বাড়িতে জমি বিক্রি করে তাদের টাকা দিয়ে লা’শ নিয়ে যেতে হয়।

মিরপুরের সামছুল হক বলেন, একটি সার্জিক্যাল মাস্ক ৭০০ টাকা রেখেছে রিজেন্ট হাসপাতাল। ১৪ দিনে তার কাছ থেকে রাখা হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ টাকা। অথচ কোনো বিলই নেওয়ার কথা ছিল না। কসাইখানা ছিল হাসপাতালটি। তাদের বিরু’দ্ধে কোনো টুঁ-শব্দ করা যেত না।

গাজীপুরের চন্দ্রার বাসিন্দা রমজান আলী বলেন, ৭ দিন আমার এক স্বজন উত্তরা রিজেন্ট হাসপাতালে ভর্তি ছিল। এ সময়ে প্রায় ২ লাখ টাকার বিল হয়। কিন্তু আমরা টাকা দিতে পারিনি। পরে সাহেদের জিম্মায় একটি বসতভিটার কিছু কাগজ রেখে ছাড় পাই। সেই কাগজ এখনো আমরা পাইনি। তবে পুলিশ বলেছে কাগজটি ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করবে।

ডিবির যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, সাহেদ কখনো ক্লিন ইমেজের লোক ছিল না। জেরায় সে বলে, “আমার ইমেজ আছে।” আসলে ওর কিছুই নেই। প্রকৃতপক্ষে সাহেদ একজন ধুরন্ধর, অর্থলিপ্সু ও পাষ’ণ্ড। অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে তাদের কাছে মানুষের জীবন-মৃ’ত্যুর কোনো মূল্য নেই। সাহেদ তার সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে করোনা পরীক্ষার রিপোর্ট ও চিকিৎসা দেওয়ার নামে জালিয়াতি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তার জালিয়াতির বিষয়টি জানার পর কোনো রোগী যদি প্রতিবাদ করতেন, তাদের বিভিন্নভাবে হুম’কি দেওয়া হতো। এর ফলে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পেতেন না। গত মার্চ মাস থেকে এখন পর্যন্ত সাহেদ করোনার ভুয়া রিপোর্ট ও চিকিৎসার জালিয়াতির মাধ্যমে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে আমরা নিশ্চিত হয়েছি।

এ ডিবি কর্মকর্তা আরও বলেন, অর্থ লু’টপাট করার কথা স্বীকার করেছে সাহেদ, মাসুদ পারভেজ ও তারেক শিবলী। তারা নানা রকমের তথ্য দিচ্ছে।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, সাহেদ রাষ্ট্রীয় সব অনুষ্ঠানে অবাধে অংশগ্রহণের সুযোগ পেত। যেগুলোতে প্রবেশাধিকারে পুলিশের বিশেষ শাখার নিরাপত্তা পাস বাধ্যতামূলক। সাহেদ সেটা আদৌ সংগ্রহ করেছিল নাকি অন্য কোনো বিকল্প উপায়ে ওইসব অনুষ্ঠানে প্রবেশাধিকার পেত সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি তার নামে নিরাপত্তা পাস ইস্যু করা হয়ে থাকে সেটাও বাতিল করা হবে। কারণ এ বিষয়ে খোদ সরকারপ্রধানেরই নির্দেশনা রয়েছে সাহেদের ইস্যুতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। কঠোরভাবে তাকে আইনের আওতায় এনে সাজার মুখোমুখি করতে হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, দু’দিন আগে সাহেদের অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল করেছে সরকার। দৈনিক নতুন কাগজ নামে একটি পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড নেন তিনি। তার কার্ডের নম্বর-৬৮৪৫। গত বছর ৩ ডিসেম্বর তার কার্ডটি ইস্যু করে তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি)। ১ বছর মেয়াদি কার্ডের মেয়াদ ছিল চলতি বছর ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

তিনি আরও বলেন, রিমান্ডের ৫ম দিনে ডিবি হেফাজতে থাকা সাহেদের কাছ থেকে তার আরও ৩ ঘনিষ্ঠ সহযোগীর নাম পাওয়া গেছে। সাহেদ জানিয়েছে- তার ওই সহযোগীরা এখনো রাজধানীতে ঘাপটি মে’রে আছে। তার দেওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে পলাতক সহযোগীরাও আটক হবে।

সাহেদের জাতীয় পরিচয়পত্র অ’কার্যকর: ইতিমধ্যে সাহেদের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) অ’কার্যকর করা হয়েছে। তিনি জাতীয় পরিচয়পত্রে নিজের নাম সংশোধন করে ‘সাহেদ করিম’ থেকে হয়েছেন ‘মোহাম্মদ সাহেদ’। ওই জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) স্থ’গিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন সচিব মো. আলমগীর। সাহেদের নাম পরিবর্তন জালিয়াতির সঙ্গে ইসির কারা জড়িত, খুঁজে বের করতে তদন্ত চলছে। জড়িতদের বিরু’দ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রমাণসাপেক্ষে সাহেদের বিরু’দ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৯ জনের নাম এসেছে: তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, যারা নানাভাবে সাহেদকে সাহায্য সহযোগিতা করে এসেছেন এমন ১৯ জনের নাম পেয়েছেন তারা। সাহেদও তাদের এর বিনিময়ে দিয়েছেন অর্থকড়ি, গাড়ি, বিদেশে ভ্রমণের সুবিধা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাহেদকে প্রাথমিক জেরা, তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট, ঘটনাস্থলে যাতায়াতসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই-বাছাই করে ১৯ জনকে চিহ্নিত করেছে।

গত ৬ জুলাই ঢাকার উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। করোনা জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অ’নিয়মের কারণে ওই হাসপাতালটি সিলগালা করে দেওয়া হয়। হাসপাতালের চেয়ারম্যান সাহেদ তখন থেকেই পলাতক ছিলেন। এ সময়ে সাহেদ নানাভাবে চেষ্টা করেছেন নিজেকে রক্ষার। যোগাযোগ করেছেন প্রভাবশা’লীদের সঙ্গে। কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি।

দেশরূপান্তর

0 Shares