পুলওয়ামা থেকে গালওয়ান ভ্যালি: লাশ নিয়ে রাজনীতি?

0 Shares

গ্রিক নাট্যকার সোফোক্লেস জানতেন, খুন হওয়া যোদ্ধারা শাসকদের সামনে চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি সুযোগও এনে দেন। তার নাটক অ্যান্টিগনে, খ্রিস্টপূর্ব ৪৪১ সালে প্রথম অভিনীত, দুই মৃত যোদ্ধার প্রতি নজিরবিহীন আচরণ প্রদর্শন করা হয়। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগের এই ট্রাজেডি আধুনিক অনেক লেখকের মাধ্যমে এখনো প্রাসঙ্গিক রয়েছে।

অ্যান্টিগনের শুরুতে দেখা যায়, সবেমাত্র একটি গৃহযুদ্ধ সমাপ্ত হয়েছে। যুদ্ধরত দুই ভাই ইটেওক্লেস ও পলিনিসেস উভয়েই নিহত হওয়ায় সিংহাসন চলে যায় তাদের চাচা ক্রিয়নের হাতে। নতুন রাজা ঘোষণা করেন, ইটেওক্লেস বীর, তাকে সম্মানের সাথে সমাহিত করা হবে। আর পলিনিসেস হলো বিশ্বাসঘাতক। তার লাশ শেয়াল-শকুনের জন্য ফেলে রাখা হবে। তবে ১৯৪৪ সালে নাৎসি দখলে থাকা প্যারিসে অভিনীত অ্যান্টিগনে জ্যাঁ অ্যানোইল রাজা ক্রেয়নের স্বৈরতান্ত্রিকতা ও নৈরাশ্যকে গুরুত্ব দেন। তিনি দুই ভাইকে থেবসকে বিক্রির চেষ্টাকারী বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি তাদের বোন অ্যান্টিগনকে জানান যে আঘাতের কারণে দুজনের কাউকে চেনা যাচ্ছে না। অথচ উত্তেজিত জনসাধারণকে শান্ত করার জন্য একজনকে ভালো আর আরেকজনকে খারাপ হিসেবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। তিনি ‘অপেক্ষাকৃত সুন্দর’ লাশটিকে ইটেওক্লেস হিসেবে ঘোষণা করেন।

ক্রেয়নের নির্দেশ উপেক্ষা করে অ্যান্টিগন সমাহিত করেন পলিনিসের লাশ। এতে করে যে যুদ্ধ শুরু হয় তাতে অ্যান্টিগন, তার বাগদত্তা হামন (তিনি ছিলেন ক্রেয়নের ছেলে) ও হামনের মা ইউরিডাইসের প্রাণ যায়।

যুদ্ধকে পরিশোধন করা

যুদ্ধ সবসময়ই জনসাধারণের সংশ্লিষ্ট বিষয়। এতে মৃত ব্যক্তি সবসময়ই ভূমিকা পালন করে। সরকারগুলো যুদ্ধ-উন্মাদনা বা সমন্বয় সাধন- যাই হোক না কেন তাদের ইচ্ছাপূরণের দিকে জনসাধারণকে চালিত করার জন্য এসব ভাবমূর্তিকে ব্যবহার করে। আর স্বাভাবিকভাবে মিডিয়ার বেশির ভাগই একটি পর্যায় পর্যন্ত তাদের জাতির সরকারকে সমর্থন করে। ওই পয়েন্টটি ভিয়েতনামে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ভিয়েতনামে মৃত্যু আর আহতের ছবি আমেরিকান জনগণকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে চালিত করে। পরিণতিতে যুদ্ধ প্রতিবেদন পরিশোধন করার জন্য আমেরিকান প্রশাসন সৈন্যদের প্রাইভেসির অধিকার, তাদের পরিবারের যন্ত্রণাকে ব্যবহার করে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা খর্ব করে।

গত ১৫ মাসে ভারত দুটি বড় ট্রাজেডির মুখোমুখি হয়েছে, সরকার ঘটনা দুটিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে চিহ্নিত করেছে। ক্রেয়নের মতো ইটেওক্লেস ও পলিনেসের মতো না হলেও বৈপরীত্য চোখে পড়ার মতোই ছিল।

আরও পড়ুনঃ দেপসাং সমতলে ভারতের জন্য নতুন বিপদ, বটলনেকের কাছে পৌছে গেছে চীনা বাহিনী

২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জম্মু ও কাশ্মিরের পুলওয়ামায় এক আত্মঘাতী বোমা হামলায় কেন্দ্রীয় রিজার্ভ বাহিনীর ৪০ সদস্য নিহত হয়। লাশগুলোর মধ্যে একটি ছিল নাসির আহমদের। তিনি কাশ্মিরে রাজৈরিতে বাস করতেন। বিমানে করে তার লাশ দিল্লিতে নিয়ে যাওয়া হয়, তা গ্রহণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। তার কফিন তেরঙা কফিনে মোড়ানো হয়, তাতে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন ভারতের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানেরা, কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র সিং।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলো বিমান অবতরণ, লাশ গ্রহণ সবকিছুই সরাসরি প্রচার করে। নিহত সৈন্যদের পরিবারের জন্য কোটি কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহ করা হয়। ওই ট্রাজেডির এক দিন পর তাদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য ক্যামোফ্লেজ পরিধান করে নতুন নজির স্থাপন করে।

চলতি বছর ১৫ জুন বিরোধপূর্ণ গালওয়ান ভ্যালিতে চীনা বাহিনীর সাথে যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২০ সদস্য নিহত হয়। পুলওয়ার মতো কোনো অনুষ্ঠান না করে এবার লাশগুলো চন্ডিগড়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে তাদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে লাশগুলোকে নিজ নিজ পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। নিহতদের প্রতি প্রথাগত সম্মান করা হলেও পুলওয়ামায় যেভাবে করা হয়েছিল, তা হয়নি। হয়তো রাজনৈতিক ফায়দার দিকে লক্ষ্য রেখেই তা করা হয়নি।

দাঙ্গাবাজদের হামলা

পুলওয়ামার পর সাধারণ নির্বাচন হয়। সেটি ক্ষমতাসীন দলের জন্য ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিজেপি এই সুযোগটি কাজে লাগায় নির্বাচনে। পরিণতিতে ১৯৮৪ সালের পর এবারই কোনো দল পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল।

লাশ নিয়ে রাজনীতির তৃতীয় উদাহরণ হতে পারে গুজরাটে, ২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারির ঘটনায়। তখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। গোধরা স্টেশনে হট্টগোলের মধ্যে মুসলিমরা হিন্দু তীর্থযাত্রীবোঝাই সবরমতি এক্সপ্রেসে আগুন লাগিয়ে দেয়। তীর্থযাত্রীরা মুসলিমদের বাবরিমসজিদ খ্যাত স্থান অযোধ্যা থেকে ফিরছিল। এতে ৫৯ জন তীর্থযাত্রী পুড়ে মারা যায়।

আরও পড়ুনঃ চীনের ব্যাপারে ‘হিসেবে ভুল করলে’ চড়া মূল্য দিতে হবে ভারতকে

প্রশাসনের দায়িত্ব হলো ভাবাবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখা, পরিস্থিতি শান্ত রাখা। সেটা স্মার্ট ফোনের যুগ না হওয়ায় কাজটি অনেক সহজ ছিল।

কিন্তু এর বদলে লাশগুলোকে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জয়দীপ প্যাটেলের তদারকিতে রাখা হয়। তিনি না ছিলেন কোনো সরকারি পদে বা কোনো মৃতের স্বজনও ছিলেন না তিনি। তার নেতৃত্বে শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে প্রবল ক্ষুব্ধ স্লোগান দেখা যায়।

উত্তপ্ত পরিবেশ

ওই সময়ে আহমদাবাদের পুলিশ কমিশনার পিসি পান্ডে (তিনি ছিলেন নরেন্দ্র মোদির কঠোর সমালোচক)। পরে তিনি বিচারপতি নানাবতি কমিশনের কাছে সাক্ষ্যে বলেন, যে আহমদাবাদে উত্তপ্ত পরিবেশে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে লাশগুলো নিয়ে গিয়েছিলেন।

মোদির বিরোধিতাকারীরা মনে করেছিল যে ২০০২ সালের ওই দাঙ্গা (যাতে শত শত লোক নিহত হয়েছিল এবং তাদের বেশির ভাগই ছিল মুসলিম) তার পতনের কারণ হবে। কিন্তু কার্যত তা মোদির জন্য সবচেয়ে বড় অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এই ঘটনা এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে যে, তিনিই হিন্দুদের রক্ষা করতে পারবেন। তাকে জাতীয় নেতায় পরিণত করে। ওই সময়ে মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের মতো বিজেপির নেতাদের থেকে তাকে আলাদা করে ফেলে। আর তাকে সবচেয়ে শক্তিশালী নেতা হিসেবে তুলে ধরে।

Source স্ক্রল.ইন

0 Shares