এডওয়ার্ড বার্নেইস,নারীবাদ ও পাবলিক মাইন্ড ম্যানিপুলেশন

0 Shares

এডওয়ার্ড বার্নেইস ছিলেন প্রোপাগাণ্ডার জনক। প্রোপাগান্ডা শব্দটি জার্মানদের কারনে নেগেটিভ অর্থ ধারন করলে তিনি তার কর্পোরেট মাইন্ড ম্যানিপুলেশনের নাম দেন পাবলিক রিলেশন, তাই তাকে বলা হয় ফাদার অভ পাবলিক রিলেশন।

১৮৯১ সালের ২২ নভেম্বর ভিয়েনার একটি ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বার্নেইস। তিনি মনস্তত্ত্বের আরেক বিখ্যাত ব্যক্তি সিগমুন্ড ফ্রয়েডের আত্মীয়। তার পরিবার ১৮৯০ সালে ভিয়েনা থেকে নিউইয়র্কে চলে আসে।

সম্পর্কে সিগমুন্ড ফ্রয়েডের ভাগনে হওয়ায় সাইকোলজিতে আগ্রহ ছিলো তার।কর্মজীবনের শুরুতে বেশ কয়েক বছর সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। সেই সময়ই জনগণের মন বোঝার আশ্চর্য দক্ষতা ও দূরদর্শিতা প্রদর্শন করেন তিনি।

তিনিই প্রথম মিডিয়াসহ সকল ক্ষেত্রে এডভেটাজইমেন্ট এবং প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর বিষয়টি বাস্তবে রূপান্তর করেন ।

বার্নেইস বলেন “People are rarely aware of the real reasons which motivate their actions.” অর্থাৎ আমরা যেসব কাজ করি বা যেসব চিন্তাধারা পোষণ করি তার পেছনের আসল কারনগুলো অধিকাংশ সময়েই আমাদের অজানা থেকে যায়।

তিনি মনে করতেন জনগন হলো ভেড়ার পাল ,আর তাদের নিয়ন্ত্রণ করে কিছু অদৃশ্য শক্তি আর যারা একে ধরতে পারবে তারাই হবে জনগনের নিয়ন্ত্রক।
আর এই ধারনাকে নিয়েই পরবর্তীতে আমেরিকাসহ সমগ্র পৃথিবীর চিন্তার নিয়ন্ত্রনের কৌশল চালু করেন তিনি। আর তার প্রবর্তিত এই কৌশল আজও মার্কেটিং কোম্পানিগুলো ব্যবহার করেই যাচ্ছে।

এডওয়ার্ড বার্নেসই প্রথম সফল পাবলিক রিলেশন ক্যাম্পেইনের মূলে ছিলেন যার নাম ছিলো ‘Torches of Freedom’ বা স্বাধীনতার আলোকবর্তিতা ।

Torches of Freedom’ /স্বাধীনতার আলোকবর্তিতাঃ

আমরা আজ টেলিভিশনে নাটক,সিনেমা গল্পের চরিত্রে নারীবাদীদের সিগারেট খেয়ে স্বাধীনতা অর্জন করার যে বক্তব্য দেখতে পাই তার সূচনা হয়েছিল বার্নেইসের হাত ধরেই।

যদিও এই ক্যাম্পেইনটি মূলত ছিল সিগারেট ব্যাবসার জন্য নারীবাদের ব্যানারে একটি মাস্টারমাইন্ড প্রোপাগান্ডা।

১৯২০ এর দশকের দিকের কথা, বার্নেইস সে সময় বিখ্যাত চেস্টারফিল্ড সিগারেটের নির্মাতা লীগেট ও মায়ার্স কোম্পানির জন্য কাজ করেন। এই সময় লাকি স্ট্রাইক নামে আরেকটি প্রতিযোগী সিগারেটের ব্র্যান্ডকে পিছে ফেলে দেয়ার পরে আমেরিকান টোবাকো কোম্পানির মালিক তাকে লীগেট ও মায়ার্স থেকে কিনে নেন।

সেখানে বার্নেইসকে দায়িত্ব দেয়া হয় নারীদের হাতে সিগারেট ধরানোর।

সেসময় ইউরোপে নারীরা ধূমপান করতো না।আর নারীদের ধূমপানকেও সামাজিকভাবে ভালো চোখে দেখা হতোনা ।
সেই মালিক ভাবলেন নারীদের হাতে সিগারেট ধরিয়ে দিতে পারলে তার বিক্রি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাবে,আর তা করাট দায়িত্ব পড়ে বার্নেসের ওপর।

বার্নেস তার কাজের শুরুতেই নারীদের মধ্যে সিগারেট জনপ্রিয় করার জন্য বিভিন্ন প্রচারণা চালাতে থাকেন। প্রথমে এটিকে একটি সৌন্দর্যবর্ধক পণ্য হিসেবে দেখানো হয় অর্থাৎ সিগারেট খেলে নারীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। একই সাথে সিগারেট খেলে ওজন কমা এমনি ডাক্তারদের ব্যবহার করে সিগারেটের স্বাস্থগত উপকারিতা নিয়েও প্রচারণা করেছিলেন। কিন্ত এসব মার্কেটিং এর ফলেও নারীরা সিগারেট হাতে তুলে নিচ্ছিলনা।

কর্মজীবনের শুরুতে জনতথ্য পরিষদে কাজ করা বার্নেস এবার মামা ফ্রয়েডের ছাত্র মনস্তাত্ত্বিক আব্রাহাম বিলের শরণাপন্ন হলেন পুরুষের ধূমপান করাকে নারীরা কি চোখে দেখেন তা জানতে । ব্রিল তাকে জানান,
“সিগারেট হলো পুরুষাঙ্গ বা পুরুষ যৌন ক্ষমতার প্রতীক। তাই সিগারেট দিয়ে যদি পুরুষ ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে এর বিপরীতে দেখানো ও প্রচার করা যায় তবেই মহিলারা সিগারেট ধরানো যাবে । কারণ তখন সিগারেটটাই হয়ে যাবে মহিলাদের পুরুষাঙ্গ বা ঐ ক্ষমতা।”

এই ধারনাকে ব্যবহার করে তিনি এক জাদুকরী চাল চাললেন,তার উদ্দেশ্য এবার লাকি স্ট্রাইক ও সিগারেট বিক্রি বাড়ানো হলেও তিনি ধূমপানের মাধ্যমেই পুরুষ নারীর ওপর শক্তিমত্তা চর্চা করে এবং নারীদের ধূমপান করাকে নারী স্বাধীনতা এবং তাদের অধিকার হিসেবে প্রচারণা চালাতে লাগলেন ।

এরপরই বার্নেইস তার ক্যাম্পেইন শুরু করেন,১৯২৯ সালের ৩১ মার্চে ইস্টার সানডের প্যারেডের মাঝে এক ভাড়া করা অভিনেত্রী ভিড় থেকে বের হয়ে সবার সামনে সিগারেট ধরান। এতে একটি সমাজে একটি হট্টগোল শুরু হয়, আর বার্নেইসের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী তা যা সংবাদপত্রে প্রচুর কভারেজ পায়।

এবার বার্নেইস প্রচারণা চালাতে লাগলেন নারী তোমার জ্বালানো সিগারেটের আগুনই তোমার স্বাধীনতা,আর এর নাম দেন ‘Torches of Freedom’ .
পুরো ঘটনাটিই ছিল এমনভাবে সাজানো, যাতে জনগণের কাছে বার্নেইসের পাঠানো বার্তাটিই যায়।

এই ঘটনার পর থেকেই নারীরা তার প্রোপাগান্ডায় প্রভাবিত হয়ে ধূমপান শুরু করে, ফলে হুহু করে বাড়তে থাকে লাকি স্ট্রাইক ও সিগারেট বিক্রির হার, তামাক ইন্ডাস্ট্রি এক ধাক্কায় চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
আর সিগারেট বিক্রির ক্যাম্পেইন পরিচিতি পায় নারীবাদী আন্দোলন হিসেবে।

বার্নেইসের সেই দেখানো পথ পরবর্তীতে মার্কেটিং এর প্রধান মানদণ্ড হয়ে উঠেছে।

কখনও কি মনে মনে প্রশ্ন জাগে আমরা যেসব প্রোডাক্ট প্রতিনিয়ত ব্যবহার করছি তা কি সত্যিই আমাদের প্রয়োজনের তাগিদে করছি নাকি মানসিক শান্তির জন্য করছি?
আর ব্যবহার না করলে মানসিক অশান্তিই বা হবে কেন?
কেনই বা সামান্য জি বাংলার জামা কিনে না দেয়ায় কিশোরীটি আত্মহত্যা করছে কিংবা স্কুল পড়ুয়া বালকটি বাইক কিনে না দেয়ায় পিতাকে হত্যার মতো ভয়াবহ কাজ করছে!

এর মূল কারন হলো ফ্যান্টাসি,কর্পোরেট কোম্পানি গুলোর প্রোডাক্ট সেলের মানদণ্ড আজ চাহিদার ওপর দাড়িয়ে নেই তা আজ মানুষের ফ্যান্টাসি তৈরী করে তার ওপর মার্কেটিং করা হয়, আর এই ফ্যান্টাসিও তারাই ঠিক করে দেয়।

‘মাই লাইফ মাই চয়েজ’ আজ মর্ডানিজমের অন্যতম ডায়লগ হলেও এর চয়েসগুলো অধিকাংশ সময়ই নির্ধারন করে দেয়া হয় কর্পোরেট কোম্পানি দ্বারা।

আমাদের মডার্ন লাইফের অধিকাংশ নিড/ডিমান্ড আর্টিফিশিসাল ওয়েতে ম্যানিপুলেট করা। আর এইসব ডিমান্ডের দিয়েই তৈরী করা হয়েছে তথাকথিত সোসাল স্টাটাসকে, আর পূরনের লক্ষেই আমরা অধিকাংশ সময় কাজ করে যাচ্ছি।

এর আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কিনা সেই প্রশ্ন নিজেকে করি, নয়তো ম্যাট্রিক্সের আর্টিফিশিয়াল জগতকে মরফিয়াস যেমন ‘Prison of our own mind’ বলেছিল তেমনি এক ‘Prison’ এ আমাদের চিরকাল আবদ্ধ থাকতে হবে।

cd Alexter Anjum

0 Shares