ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকছে গডফাদাররা!

0 Shares

কদিন আগে দেশব্যাপী আলোচিত হয়েছিলেন যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, টেন্ডার কিং জি কে শামীম, যুব মহিলা লীগের নেত্রী শামিমা নূর পাপিয়াসহ বেশ কয়েকজন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। তারা এখন শিকলবন্দি হলেও ওই সময়ে আলোচনায় এসেছিল আড়ালে গডফাদাররা। কিন্তু সেইসব ঘটনার গতি থেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই থেমে যায় গডফাদারদের আলোচনা।

এবার আলোচনায় বিতর্কিত ক্ষমতাসীন দলের নেতা সংসদ সদস্য শহীদ ইসলাম পাপুল, স্বাস্থ্য খাতে ভয়াবহ সিন্ডিকেটের প্রধান মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু, রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মহাপ্রতারক শাহেদ করিম এবং জেকেজি হেলথ কেয়ারের বিতর্কিত ডা. সাবরিনা ও তার স্বামী আরিফ চৌধুরী।

আগের মতো এবারও আলোচনায় গডফাদাররা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিশিষ্টজনেরা প্রশ্ন তুলছে, কী করে নানামুখী অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন, কারা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিতেন। চিহ্নিত করে তাদের মুখোশ উন্মোচন করার সময় এসেছে।

বিশিষ্টজনেরা বলেন, বার বার এসব ঘটনা পুনরাবৃত্তি ঘটছে। তাই এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে মূলে আঘাত করা ছাড়া বিকল্প নেই। বিচারের আওতায় আনতে হবে গডফাদারদেরও।

জানা গেছে, বেশ নাটকীয়ভাবে সংসদ সদস্য হয়েছেন লক্ষ্মীপুর-২ আসনের আওয়ামী লীগ নেতা পাপুল। তার স্ত্রী সেলিনা ইসলামও হয়েছেন নারী সংরক্ষিত আসনের এমপি। আলোচনায় ছিল পাপুলের আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে এমপি হওয়রার বিষয়টি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারে প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশও রয়েছে এতে। পাপুলকে সমর্থন দেওয়ার জন্য লক্ষ্মীপুর জেলা আওয়ামী লীগকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি থেকে। একই সময় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান মহাজোট প্রার্থী জাতীয় পার্টির নোমান মিয়া। আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লক্ষ্মীপুর-২ আসনে ভোটে জেতেন পাপুল। নিজে এমপি হয়ে থেমে থাকেননি, প্রভাব খাটিয়ে স্ত্রীকেও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য করেছেন। প্রশ্ন উঠেছে, কোথায় পাপুলের ক্ষমতার উৎস? পেছন থেকে কে নেড়েছেন কলকাঠি?

প্রশ্ন উঠছে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পরিচয় দেয়া রিজেন্ট গ্রুপের মো. সাহেদকে নিয়েও। সাহেদ ঢাকার বাইরে গিয়ে পুলিশ প্রটোকল নিতেন। কীভাবে মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সধারী দুটি হাসপাতাল ও একটি হোটেল থেকে ব্যবসা করেছেন। কীভাবে এই অবৈধ হাসপাতাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের সঙ্গে চুক্তি করেছে। রাষ্ট্রীয় সব অনুষ্ঠানে সাহেদকে নিয়মিত দেখা যেত। প্রতারণাসহ ৩২ মামলার আসামি সাহেদ আওয়ামী লীগের উপকমিটিতেই বা কীভাবে জায়গা পান, তা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

আরেক প্রতারক দম্পতি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন ডা. সাবরিনা আরিফ ও তার স্বামী আরিফ চৌধুরীর পেছনের গডফাদারদের নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

প্রশ্ন উঠছে, ন্যূনতম একটি ট্রেড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও কী করে এই ভুয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতর চুক্তি করল? কারা তাদের এই সুযোগ তৈরি করে দিলেন? কী কারণেই বা তাদের এমন সুযোগ দেওয়া হলো? এসব নিয়েও প্রশ্ন সব মহলে।

এসব বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক গণমাধ্যমকে বলেন, পাপুল, মিঠু, সাহেদ বা ডা. সাবরিনা-এরা কিন্তু নিজে নিজে গড়ে ওঠেনি। তাদের পেছনের শক্তি হিসেবে সব সময় কেউ না কেউ কাজ করেছেন। বর্তমানে নিশ্চয়ই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরই কেউ পেছন থেকে এদের মদদ দিয়ে আসছেন। আবার অন্য সরকারগুলোর সময়ও কেউ না কেউ তাদের মতো অপরাধীদের মদদ দিয়েছেন। তাই শুধু তাদের বিচার করলেই চলবে না। এসব অপরাধের মূলোৎপাটন করতে হবে। আঘাত করতে হবে গোড়ায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, করোনাভাইরাস যেমন একটি শারীরিক ব্যাধি, তেমনি দুর্নীতিও একটি সামাজিক ব্যাধি। এখন যারাই ধরা পড়েছেন, তারা হচ্ছেন সেই ব্যাধির উপসর্গ। তারা কখনোই এসব অনিয়ম-দুর্নীতি একা একা করতে পারতেন না। তাদের পেছনে অবশ্যই প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের শরীরে কোনো ব্যাধির উপসর্গ দেখা দিলে আমরা যেমন তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হই এবং নির্মূল হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা করি, তেমনি সাম্প্রতিক সময়ের কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনার মতো সব ধরনের দুর্নীতির ঘটনায়ই শুধু চিহ্নিত অপরাধীদের বিচার করে বসে থাকলে হবে না, এদের পেছনে কারা আছেন, কারা তাদের মদদ দিয়েছেন, তাদেরও খুঁজে বের করতে হবে এবং বিচারের আওতায় আনতে হবে।’

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বড় কয়েকটি বিতর্কিত ঘটনা আমাদের চিন্তিত করেছে। যারা এসব বিতর্কের সঙ্গে জড়িত, তাদের পেছনের শক্তি হিসেবে অবশ্যই কেউ না কেউ রয়েছেন। প্রভাবশালীরাই তাদের পেছন থেকে মদদ দিয়েছেন। তাই এসব অপরাধীকে বিচারের পাশাপাশি তাদের গডফাদারদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে।’

নোট: রিপোর্টটি দেশের শীর্ষ গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

0 Shares