দুর্বলের কথা ফেসবুকও শোনে না

0 Shares

দুর্বলের কথা ফেসবুকও শোনে না। ফেসবুক ভারতে বিজেপি আর ইসরায়েলের জায়নবাদীদের কথা শোনে, কিন্তু ভারতের দুর্বল, নিপীড়িত ও বিরোধীদের পোস্ট মুছে দেয়, অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। একই ঘটনা ঘটেছে ইসরায়েলেও। ফিলিস্তিনিদের হত্যা-নির্যাতন এবং তাদের ভিটেমাটি দখলের ছবি মুছে দেয়, সংবাদ খেয়ে দেয়, প্রতিবাদীদের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে, কিন্তু ফিলিস্তিনি হত্যার ডাক দেওয়া ইসরায়েলিদের পোস্ট উপেক্ষা করে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা চালানোর উসকানিগুলো ছড়িয়েছিল ফেসবুক মারফত। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এই অভিযোগও মার্ক জাকারবার্গ পাত্তা দেননি। তাদের নীতিমালার ছাঁকনি ইরান-চীন-ফিলিস্তিনিদের বেলায় যত অটুট, হিন্দুত্ববাদী, জায়নাবাদী ও উগ্র বর্মি বৌদ্ধবাদীদের বেলায় ততটাই উদার।

ফেসবুক গোড়া থেকেই চিন্তাপুলিশের কাজ করত। তাদের নীতিমালায় পাস না হওয়া মতামত, ছবি, ভিডিও ডিলিট করে দিত। কিন্তু সেই পুলিশি নীতিমালা কারও বেলায় উদার, কারও বেলায় হিংসুক। এই একচোখা নীতির চলতি উদাহরণ হাজির করেছে বিখ্যাত মার্কিন পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। তারা দাবি করেছে, বিজেপি নেতাদের মুসলিম ও সেক্যুলারবিদ্বেষী বক্তৃতা-লেখা-ছবি-ভিডিওর বেলায় ফেসবুক তার স্বঘোষিত নীতি মোটেই মানছে না। বলা হচ্ছে, তারা বিজেপিকে রাগাতে ভয় পায়। ফেসবুকের ‘বিদ্বেষ রোধ’ নীতি প্রয়োগে বাধা দেওয়ার এই কাজ করেছেন ভারতের ফেসবুকের পাবলিক পলিসি এক্সিকিউটিভ আঁখি দাস। ভারতীয় গণমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, আঁখি দাসের বোন রেশমি দাস দিল্লির জেএনইউতে বিজেপির ছাত্রসংগঠনের সভাপতি ছিলেন। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল দাবি করেছে, বিজেপি নেতাদের ফেসবুকীয় আইন ভাঙার শাস্তি দিলে, তাঁদের পোস্ট মুছে দিলে বা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করলে ভারতে ফেসবুকের ব্যবসায়িক ক্ষতি হবে। তাই মানবতার ক্ষতি বা সহিংসতার উসকানি প্রচার করে মানুষের জানমালের হুমকি সৃষ্টি হলেও তাদের ব্যবসা করে যেতে হবে। মার্ক জাকারবার্গের নিরপেক্ষতার মুখোশ খসে যাওয়ার বিনিময়েও ফেসবুককে বিজেপিবান্ধব থাকতে হবে।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল তাদের প্রতিবেদনে এ ধরনের দ্বিচারিতার কিছু উদাহরণ তুলে দিয়েছে। তেলেঙ্গানার বিজেপি বিধায়ক টি রাজা সিংহ মাঠেঘাটে তো বটেই, ফেসবুকেও একাধিকবার সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উসকানি ছড়িয়েছেন। ভারতের আইনে যা থাকে থাকুক, ফেসবুকের আইনে তো এসব ‘অপরাধ’। সুতরাং ফেসবুকের কর্মীরা ‘বিপজ্জনক ব্যক্তি ও সংস্থা’ নীতির আলোকে টি রাজাকে নিষিদ্ধ করার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু আঁখি দাস তাঁদের নিষেধ করেন। ফেসবুকের সাবেক ও বর্তমান কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে মার্কিন পত্রিকাটি এটা জেনেছে। একই রকম সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিজেপি নেতা কপিল মিশ্র, অনন্ত হেগড়েসহ বেশ কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে। বহু রকম বিষয়ে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হিংসাত্মক প্রচারণা চালালেও ফেসবুক তাঁদের ব্যাপারে উটপাখির কৌশল নিয়ে চোখ বন্ধ করে থেকেছে।

ব্যাপারটি নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও। তাঁর অভিযোগ, ‘ভারতে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপকে নিয়ন্ত্রণ করে বিজেপি। এর মাধ্যমে ঘৃণা ছড়িয়ে বিজেপি ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চালায়।’ বিজেপি ও ফেসবুকের যোগাযোগ খতিয়ে দেখতে যৌথ সংসদীয় কমিটি গঠনের দাবিও উঠেছে। বিজেপির মিথ্যা ও হিংসাত্মক প্রচারণার বড় হাতিয়ার হোয়াটসঅ্যাপ। কংগ্রেস নেতা শশী থারুর ফেসবুকের জবাবদিহি চেয়েছেন। ফেসবুক বয়কটের ডাকও দিতে শুরু করেছেন অনেকে।

ফেসবুকের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি–বিদ্বেষের অভিযোগ অনেক পুরোনো। এটা অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় ২০১৬ সালে। তখন ফেসবুক ইসরায়েলের বিচারমন্ত্রীর সঙ্গে চুক্তি করে জানায়, তারা ফিলিস্তিনিদের পোস্টে নজরদারি করবে। সেই বছরই তারা কয়েক শ ফিলিস্তিনি অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করে। এর মধ্যে কেবল ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টই ছিল না, ছিল বেশ কিছু ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমেরও অ্যাকাউন্ট। ফিলিস্তিনি অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, কোনো ইসরায়েলি ফিলিস্তিনি হত্যা করার আহ্বান জানালেও তার কিছু হয় না। কিন্তু সেসব হত্যার খবর, ছবি, প্রতিবাদ প্রকাশ করলেই নেমে আসে ফেসবুকের তালেবান কায়দার নিষিদ্ধপ্রিয় তরবারি।

কার কথা আর বলব। এই লেখকের একটি পোস্টও ফেসবুকের দ্বারা ‘হারাম’ বলে ঘোষিত হয়েছে। ইরানের নিহত জেনারেল সোলাইমানিকে নিয়ে দেওয়া সেই পোস্টে কোনো রাগ-ক্ষোভ কিছুই ছিল না, ছিল কেবল বিশ্লেষণ। কিন্তু ফেসবুক নীতিমালায় তা আটকে যায় এবং পোস্টটি তারা তুলে নেয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার নাপাম বোমায় পুড়তে পুড়তে দৌড়াতে থাকা একটি কিশোরীর ছবি দুনিয়াজুড়ে খুব বিখ্যাত হয়। ‘নাপাম গার্ল’ নামে সেই মেয়েটির ছবিও গত বছর ফেসবুক নিষিদ্ধ করে। এমনকি নরওয়ের প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ‘নাপাম গার্ল’ পোস্টও তাদের নিষিদ্ধের তরবারির কোপে পড়ে।

যার কেউ নেই, তার নাকি ফেসবুক আছে। ফেসবুকের সেই নিরপেক্ষতার মুখোশ খসে পড়ছে। চীন ১১ বছর ধরে তাদের দেশে ফেসবুককে নিষিদ্ধ করে রেখেছে। ফিলিস্তিনিরা নিজেদের জন্য ‘SADA’ নামে সামাজিক গণমাধ্যম তৈরি করেছে। দুর্বলের কথা যদি ফেসবুক না-ই শোনে, তাহলে দুর্বলকে ফিরতে হবে সেই বাস্তবে, যেখানে সত্যিকার মানুষ আছে। ফেসবুকের মুখোশ নিশ্চয়ই জীবনের মুখের চেয়ে সত্যি না।

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক। সূত্র : প্রথম আলো

0 Shares