দুর্নীতির কোন ভ্যাকসিন নেই

0 Shares

করোনাভাইরাস দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় মনে হচ্ছে ভ্যাকসিন। পূর্ব পশ্চিম সবদিকেই আশার আলো দেখা যাচ্ছে। চীন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে একটি ভ্যাকসিন তৈরি করেছে বলে জানা গেছে, যেটার পরীক্ষা এমনকি বাংলাদেশেও করা হবে। পশ্চিমে, ব্রিটেনে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণা টিমও জীবন রক্ষাকারী ভ্যাকসিন তৈরি করেছে বলে জানা গেছে। অন্যান্য দেশ ও কোম্পানিগুলোও এই ধরনের আশার বাণী শুনিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত, আমরা আত্মবিশ্বাসী যে, করোনাভাইরাসকে জয় করা হবে। বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, বহু মানুষ কষ্ট পেয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা নজিরবিহীন এবং এর অর্থনৈতিক ক্ষতি হিসেবের বাইরে চলে গেছে, কিন্তু আলেক্সান্ডার পোপ তার বিখ্যাত উক্তিতে যেমনটা বলেছেন, “মানুষের হৃদয়ে আশার প্রবাহটা চিরন্তন”।

কিন্তু বাংলাদেশে আরেকটি ভাইরাস রয়েছে (এবং নিঃসন্দেহে বিশ্বের অন্যান্য অংশেও এই ভাইরাস রয়েছে) যেটার কারণে দেশ অন্ধকারে লড়াই করছে। বছরের পর বছর ধরে ভাইরাস আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে এবং সাম্প্রতিককালে এটা যেন কোভিড মহামারীকেও ছাপিয়ে গেছে। এই বিপজ্জনক রোগটা কি যেটা সমাজের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়েছে, যেটা আমাদের জাতির অস্তিত্বের ভিত্তিতে ঘুণ ধরিয়ে দিয়েছে? কি এই ব্যাধি যেটার কোন আরোগ্য চোখে পড়ছে না?

দুর্নীতি। এই ভয়ঙ্কর রোগের নাম হলো দুর্নীতি যেটা তার মরণ কামড় দিয়ে আমাদেরকে আঁকড়ে ধরেছে। এটা নতুন কিছু নয়, কিন্তু যখন সারা বিশ্ব করোনাভাইরাসে আক্রান্ত, যখন মানুষেরা ভ্যাকসিন, আরোগ্য, সুরক্ষা ব্যবস্থা আর এ ধরনের প্রয়োজনের মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছে, তখন দেখা যাচ্ছে আমাদের মধ্যে অনেকেই গোয়ারের মতো এই পরিস্থিতি থেকে সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করছে, এবং অতরিক্তি কিছু অর্থ (বহু বিলিয়ন) বানানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, এবং এজন্য তারা মানুষের জীবন, জীবিকা, মানবিকতা ও মানবিক বিবেকবোধ সবকিছুকে তারা জলাঞ্জলি দিয়েছে। মহামারীর সময়ে দুর্নীতির এই ব্যাপক বিস্তার শুধু ক্ষতিকরই নয়, এটা চরম অপমানজনকও বটে। ক্ষতির দিক থেকে দেখলে এর পরিমাণটা আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। এর প্রভাব ব্যাপক। এক এক ফোঁটা দুর্নীতি থেকে যে ঢেউ জাগছে, যেটা একটা বড় জলোচ্ছ্বাস হয়ে আমাদেরকে গিলে ফেলবে, আমাদের বুঝে ওঠার আগেই।

অস্বাস্থ্যকর স্বাস্থ্য খাত

মহামারীর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতটাই হলো যে কোন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত। কিন্তু এই খাতের উন্নয়নে সরকার এর আগে যত ধরনের ঘোষণাই দিয়ে থাকুক না কেন, জনগণকে বোঝানোর জন্য মন্ত্রী আর ক্ষমতাসীন দলের নেতারা যত কথার ফুলঝুড়িই ছোটান না কেন, করোনাভাইরাসের কারণে তাদের কথার সারশূন্যতা পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়ে গেছে, এবং এই খাতের ভঙ্গুর চেহারাটা ফুটে উঠেছে।

Lifts-SAM Special-Bangla-27 July 2020_1

সম্প্রতি যে কেলেঙ্কারির বিষয়টি সংবাদের শিরোনামে উঠে এসেছে, সেটা ঘটেছে রিজেন্ট হাসপাতালকে কেন্দ্র করে, যে হাসপাতালের মালিক হলেন মো. সাহেদ বা সাহেদ করিম। সাহেদ করিম দীর্ঘদিন ধরে বহু মানুষকে প্রতারণা ও বঞ্চিত করে আসছে। এক সময় সে নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটির একজন হিসেবে দাবি করেছে, আরেক সময় নিজেকে বিএনপির সদস্য হিসেবেও পরিচয় দিয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের সব নেতাদের সাথেই তার ছবি রয়েছে, স্থানীয় টেলিভিশনের টক শো-গুলোতে সে ছিল নিয়মিত অংশগ্রহণকারী, এবং বাধাহীনভাবে কথা বলে যাওয়ার গুণ তার রয়েছে। কিন্তু একই সাথে তার অনেক খেলাপি ঋণ রয়েছে, তার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো গোপন কোন বিষয় নয়। এর পরও সরকার সামনে এগিয়ে গেছে এবং তার হাসপাতালে করোনাভাইরাস পরীক্ষা করার এবং করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগিদের চিকিৎসা করার অনুমোদন দিয়েছে। সাহেদ নিজেকে উদার মানুষ হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসেছেন, এবং দুর্যোগের সময় হাসপাতালের ব্যবসায় ছাড় দিয়ে বিনামূল্যে সেবা দেয়ার দাবি করে এসেছেন তিনি।

ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেস (ডিজিএইচএস) এ ব্যাপারে রিজেন্ট হাসপাতালের সাথে সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছে, এবং এজন্য এমনকি হাসপাতালের চত্বর এবং ফ্যাসিলিটিগুলোও পরীক্ষা করা হয়নি। মজার ব্যাপার হলো সরকার এই সেবাগুলো দেয়ার ক্ষেত্রে আইসিডিডিআর,বি-কেও অনুমতি দেয়নি, যারা এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বাস্থ্য গবেষণার জন্য স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান। পরে আইসিডিডিআর,বি-কে তারা অনিচ্ছার সাথে অনুমোদন দেয়, যদিও তাদের উপর বিভিন্ন ধরনের বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেয়া হয়।

রিজেন্ট হাসপাতালের ঘটনাটি একটি বড় ধরনের কেলেঙ্কারি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, যেখানে রোগিদের কাছ থেকে বিপুল ফি নেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে করোনাভাইরাসের ভুয়া রিপোর্ট ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। সবার ক্ষেত্রেই নমুনা নেয়া হয়েছে, কিন্তু সেগুলো পরীক্ষা করা হয়নি। রোগিদেরকে ইচ্ছেমতো পজিটিভ আর নেগেটিভ রিপোর্ট ধরিয়ে দেয়া হয়েছে, এবং এর মধ্য দিয়ে মারাত্মক একটা স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের রোগিরা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর রোগমুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের আইসোলেশানে রেখেছে। এই কেলেঙ্কারির বিষয়টি আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও নজর কেড়েছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, অনেকগুলো আন্তর্জাতিক গন্তব্য বাংলাদেশীদের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। অনেক চাপ আসার পরেই কেবল হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা হয়েছে। সাহেদকে যদিও গ্রেফতার করা হয়েছে, কিন্তু র‍্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়নকে সে বলেছে যে, “তোমরা আমাকে ছয় মাসের বেশি ধরে রাখতে পারবা না!” তার এই সাহসের উৎস কি?

উত্তর খুবই সহজ, দায়মুক্তি।

দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি আর অপরাধীদেরকে যেভাবে অব্যাহতভাবে দায়মুক্তি দিয়ে আসা হচ্ছে, সেটার কারণেই জেকেজি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ চৌধুরী, এবং জেকেজির চেয়ারম্যান সাবরিনা আরিফ চৌধুরীরা ভুয়া কোভিড-১৯ পরীক্ষা কেলেঙ্কারি চালিয়ে যেতে পেরেছে তাদের হাসপাতালে। কিছুকালের জন্য তারা হয়তো কারাগারে রয়েছে, কিন্তু যে ক্ষতি তারা করে গেছেন, সেটা অপরিমেয়। এই ধরনের হাসপাতালকে কিভাবে এই ধরনের স্পর্শকাতর পরীক্ষার অনুমতি দেয়া হলো?

রাজধানী শহরে শাহাবুদ্দিন হাসপাতাল এবং ঢাকাসহ আরও কিছু জেলায় আরও বেশ কিছু হাসপাতাল রয়েছে, যেগুলো তাদের ‘করোনা বাণীজ্যের’ জন্য ধরা পড়েছে। কেলেঙ্কারির মুখে ডিজিএইচএসের ডিরেক্টর জেনারেল পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু মন্ত্রী এখনও হাসিখুশিভাবে নিজের চেয়ারে আসীন রয়েছেন। ইনি হলেন সেই মন্ত্রী যিনি ভাইরাস সংক্রমনের শুরুর দিকে সকল অভিযোগ বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে দাবি করেছিলেন যে, তারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত আছেন। কিন্তু যাদুকরি দায়মুক্তির পোষাক পরে তিনি পার পেয়ে গেছেন।

Lifts-SAM Special-Bangla-27 July 2020_2

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটিতে নিম্নমানের মাস্ক সরবরাহ করার জন্য ধরা পড়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা শারমিন জাহান। বিশ্ব ব্যাংক আর এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের অধীনে যে সব মাস্ক আর পার্সনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট (পিপিই) কেনা হয়েছে, দেখা গেছে সেগুলোও নিম্নমানের, যদিও এ জন্য অর্থ ঠিকই পুরোপুরি ব্যায় করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই সব কিছুই বরফশৈলীর চূড়া মাত্র। এর কোনটাই নতুন নয়, কিন্তু মহামারী এই সবকিছুকে সামনে নিয়ে এসেছে। আর দায়মুক্তির সংস্কৃতিও অব্যাহতভাবে চলছে।

গরিবের ত্রাণও ছাড় পাচ্ছে না

ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের জন্য বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। ব্যাঙ্কগুলো এই ঋণ দিতে পেরে খুশি কারণ এর একটা অংশ তারা রাখতে পারছে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায় খুশি কারণ তাদের ভারি পকেটগুলো আরও ভারি করতে পারছে তারা। গরিবদের কি হবে?

গরিবদেরকে চাল, ডাল, তেল, নগদ অর্থ এবং এ ধরনের জিনিস দিয়ে ত্রাণ দেয়া হচ্ছে। এমনকি যারা দারিদ্রের অশুভ চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিল, তারাও কোভিড মহামারীর কারণে চরম দারিদ্রের গভীরে নিমজ্জিত হয়েছে। তারা তাদের আয়ের পথ হারিয়েছে। এখন সরকারের সহায়তা (এনজিও, প্রাইভেট খাত এবং স্বতন্ত্র সহায়তাসহ) তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। কিন্তু এটাও এখন তাদের থেকে ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধিরা ত্রাণের জিনিসপত্র গরিবদের না দিয়ে নিজেদের বাড়িতে জমিয়ে রাখার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছে। কেউ কেউ ধরা পড়েছেন, কেউ কেউ পড়েননি। তারা তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে, ত্রাণের পণ্য কালোবাজারে বিক্রির জন্য গুদামজাত করছে।

Lifts-SAM Special-Bangla-27 July 2020_3

ত্রাণের পণ্য ও সহায়তার অর্থ নিয়ে প্রতারণার আরেকটি উদাহরণ হলো সুবিধাভোগীদের নাম তালিকাভুক্ত করা। বহু চরম গরিব মানুষ এক দানা চাল বা একটি টাকাও পায়নি সরকারের কর্মসূচি থেকে। অন্যদিকে মিডিয়ায় রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বহুতল ভবনে বসবাসরত ব্যক্তিরা ভারি ভারি ত্রাণের প্যাকেট পাচ্ছে। তাদের জিজ্ঞাসা করা হলে, তারা বলছে, “আমরা জানি না কিভাবে আমাদের নাম তালিকায় গেছে!” এখানে কোন কৌতুকের বিষয় নেই। এটা ভয়াবহরকম নিষ্ঠুরতা। এটা ভুল, অনৈতিক, অযৌক্তিক, কিন্তু এটাও এখন খুবই বাস্তব একটা বিষয়।

করোনাভাইরাস হয়তো চলে যাবে, কিন্তু দুর্নীতির এই মহামারী কি যাবে?

আমাদের নায়কেরা হলেন সামনের সারির যোদ্ধা, ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, সাংবাদিক, পরিচ্ছন্নকর্মী, রাস্তায় কাজ করা মানুষ – যারা অর্থনীতির চাকাকে সক্রিয় রেখেছেন, যে সব স্বেচ্ছাসেবীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসহায় মানুষদের সাহায্য করছেন এবং আরও অনেক ভালো কাজ যেগুলো নিরবে ঘটে যাচ্ছে। হ্যাঁ, সমাজে ভালো মানুষ আছে। এই মানুষেরাই জাতিটাকে ভাসিয়ে রেখেছেন। এই মানুষগুলো না থাকলে, দেশটি বহু আগেই অপরাধ আর দুর্নীতির বন্যায় অতলে ডুবে যেতো।

কিন্তু একটা দেশ কতদিন এই বোঝা বইতে পারে? এই অপরাধীরা যদি এমনকি বৈশ্বিক দুর্যোগের এই সময়টাতেও অসুস্থ আর অসহায়দের শোষণ অব্যাহত রাখে, তাহলে দেশের ভবিষ্যতের উপর সেটা সত্যিকারের বড় আঘাত হানতে পারে। তবে আমাদেরকে অবশ্যই আশা জাগিয়ে রাখতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই টিকে থাকতে হবে। এই সব অশুভ চক্রগুলোকে কোন করুণা দেখানো যাবে না। সরকার অপরাধ আর দুর্নীতির ব্যপারে জিরো-টলারেন্সের কথা বলেছেন। তাদের প্রতিশ্রুতির সত্যতার প্রমাণের এখনই সময়।

0 Shares