তুরস্ক-পাকিস্তানের নেতৃত্বে মুসলিম বিশ্বের নতুন জোট!

0 Shares

মুসলিম বিশ্বের নানা সংকট ও সমস্যা নিয়ে ইসলামী সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসির অকার্যকর ভুমিকায় হতাশা বাড়ছে। এর ফলে মুসলিম দেশগুলোতে ঘটতে যাচ্ছে নতুন মেরুকরণ। কীভাবে এই প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এর প্রভাব কী হতে পারে তা নিয়ে থাকছে আজকের বিশ্লেষণ।

সৌদি আরবের প্রভাবাধীন ইসলামি সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসি ফিলিস্তিন ও কাশ্মীর ইস্যুতে দীর্ঘদিন থেকে অনেকটা নীরব ভুমিকা পালন করে আসছে । ওআইসির অন্যতম প্রভাবশালী দেশ পাকিস্তান সংস্থাটির ভূকা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছে। কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা হরনের পর থেকে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের একটি সম্মেলন আয়োজনের দাবি করে আসছিলো পাকিস্তান। কিন্তু সৌদি আরবের অনাগ্রহের কারণে এই সম্মেলনটি হতে পারেনি।

ওআইসির মানবাধিকার কাউন্সিল দায়সারা ভাবে কাশ্মীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করে। কাশ্মীরে বিশেষ মর্যাদা বাতিলের বার্ষিকী উপলক্ষ্যে পাকিস্তানের একটি টেলিভিশনে সাক্ষাতকার দেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশি। সেখানে তিনি কাশ্মীর ইস্যুতে ওআইসির ভুমিকার সমালোচনা করেন। ডনের খবরে বলা হয়, শাহ মাহমুদ কোরেশি বলেন, পাকিস্তানের প্রত্যাশা কাশ্মীর ইস্যুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের একটি বৈঠক ডাকা হোক। তা যদি না করা হয়, আমি প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে বলবো ওআইসির বাইরে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের একটি সম্মেলনের উদ্যেগ নিতে। তিনি বলেন, পাকিস্তান আর অপেক্ষা করতে পারে না। আমরা এ ধরনের উদ্যেগ নিতে বাধ্য হবো।

তিনি আরো জানান, গত বছরের ডিসেম্বরে সৌদি আরবের অনুরোধে কুয়ালালামপুর সম্মেলনে যোগদান থেকে বিরত থেকেছে ইসলামাবাদ। এখন রিয়াদকে দেখাতে হবে কাশ্মীর ইস্যুতে তারা সোচ্চার আছে। উপসাগরীয় দেশগুলোকে উপলদ্ধি করতে হবে কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের আভ্যন্তরিন সংবেদনশীলতার দিকটি। পাকিস্তানের এমন অবস্থানের প্রভাব সর্ম্পকে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সৌদি আরবের সাথে আমাদের সুসর্ম্পক থাকা সত্ত্বেও আমরা এমন অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছি। কাশ্মীরীদের দুর্ভোগ নিয়ে আমরা এভাবে আর অপেক্ষা করতে পারি না।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে ওআইসির বাইরে গিয়ে কাশ্মীর নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছেন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, কুয়ালালামপুর সম্মেলনের মতো একটি ফোরামে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকিস্তান। যেখানে তুরস্ক , ইরান ও কাতারের সমর্থন থাকবে। পাকিস্তান যদি এ ধরনের একটি সম্মেলনের আয়োজন করে তাহলে ওআইসি আরো দূর্বল হয়ে পড়বে এবং মুসলিম দেশগুলোর ওপর সৌদি আরবের প্রভাব আরো কমে আসবে। ইতোমধ্যে পাকিস্তানের এমন বক্তব্য সৌদি আরব প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

আর্ন্তজাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে সৌদি আরব। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সঙ্কটে ২০১৮ সালে ৬ বিলিয়ন ডলার সাহায্য দিয়েছিলো। এরমধ্যে ৩ বিলিয়ন ডলার ছিলো ঋন এবং ৩ বিলিয়ন ডলার ছিলো জ্বালানী তেলের মুল্য বাবদ দায়। সৌদি আরব কম দামে পাকিস্তানে জ্বালানী সরবরাহ করে থাকে। এখন কম দামে জ্বালানী সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে বলে খবর এসেছে। এছাড়া পাকিস্তান ইতোমধ্যে ১ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানের যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে তা আর সহজে কাটছে না। জ্বালানী সরবরাহ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য পাকিস্তান কাতারের সাথে ঘনিষ্টতা বাড়াতে পারে। পাকিস্তানের পাশে দাড়াতে পারে কাতার। এছাড়া ইরান থেকেও কমদামে তেল কেনার সুযোগ রয়েছে পাকিস্তানের।

কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের অনুরোধ যখন সৌদি আরব প্রত্যাখান করছে তখন তুরস্ক ইসলামাবাদের পাশে দাড়িয়েছে। আর্ন্তজাতিক পরিসরে তুরস্ক এ ব্যাপারে সরব ভুমিকা পালন করেছে। এমনকি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিজেপ তাইয়েপ এরদোয়ান পাকিস্তানের পার্লামেন্টে দেয়া ভাষনে কাশ্মীরীদের পাশে থাকার ঘোষণা দেন। জাতিসংঘ অধিবেশনে দেয়া ভাষনে এরদোয়ান কাশ্মীর ইস্যু উন্থাপন করেন।

তুরস্কের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্টতা সৌদি আরবকে ক্ষুদ্ধ করে তোলে। কারন মুসলিম বিশ্বের নানা ইস্যুতে সৌদি আরবের চেয়ে তুরস্ক অনেক বেশি সোচ্চার ভুমিকা পালন করছে। অপরদিকে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের সাথে ভারতের ঘনিষ্টতা বাড়ছে। দেশ দুটিতে ইন্দো-ইসরাইল লবি অনেক বেশি তৎপর। যার প্রতিফল ঘটেছে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে নির্লিপ্ত ভূমিকায়।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন তুরস্কের নেতৃত্বে মুসলিম বিশ্বে নতুন একটি জোট গঠনের চেষ্টা চলছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালামপুরে তুরস্ক, ইরান, মালয়েশিয়া ও কাতারের উদ্যেগে অনুষ্টিত হয়েছিলো এক সম্মেলন। এই ফোরামের মাধ্যমে কাশ্মীর ইস্যু সামনে আনতে পারে পাকিস্তান। তুরস্ক ও কাতারের প্রচেষ্টায় মুসলিম বিশ্বের আরো অনেক দেশ তাতে যোগ দিতে পারে। এরফলে সৌদি আরব আরো কোনঠাসা হয়ে পড়তে পারে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ওআইসির বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করছে তুরস্ক। ২০১৯ সালে কুয়ালামামপুর সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৪ শ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। এই সম্মেলনে মুসলিম বিশ্বের সঙ্কট এবং তা সমাধানের উপায় নিয়ে নানামুখী আলোচনা হয়। উপস্থিত মুসলিম দেশগুলোর নেতারা বলেন মুসলিম বিশ্ব এক সঙ্কটের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। এই সঙ্কট সমাধানের পথ নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। সঙ্কট বুঝতে না পারলে বিপর্যয় এড়ানো যাবে না।

এই সম্মেলনের অন্যতম উদ্যেক্তা ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত এই সম্মেলনে যোগ দেননি। সৌদি আরবের চাপে পাকিস্তান এই সম্মেলনে যোগ দেয়া থেকে বিরত থাকে। তখন গনমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয় সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান হুমকি দেন পাকিস্তান যদি এই সম্মেলনে যোগ দেয় তাহলে সৌদি আরব অর্থনৈতিক সহায়তা বন্ধ করে দেবে।

গত বছরের ডিসেম্বরে কুয়ালামপুর সম্মেলনে পাকিস্তান যোগদান থেকে বিরত থাকলেও কাশ্মীর সমস্যা আলোচনায় উঠে আসে। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এ সময়, ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন একটি আইনের কারনে মানুষ মারা যাচ্ছে। ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ হিসাবে দাবি করে কিন্তু এই আইনে মুসলিমসহ নাগরিকদের অধিকার হরন করা হচ্ছে। এরমধ্য দিয়ে দ্ব›দ্ব,অস্থিরতা এবং বহু লোক সমস্যার মধ্যে পড়বে।

সম্মেলনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিজেপ তাইয়েপ এরদোয়ান মুসলিম বিশ্বের সঙ্কটের নানা দিক তুলে ধরে বলেন, ১০৭ কোটি মুসলমানের ভাগ্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৫ টি স্থায়ী সদস্য দেশের ওপর নির্ভর করতে পারে না। এই ৫ দেশের চেয়ে বিশ্ব অনেক বড়। এরদোয়ান বলেন আমাদের নীরব করার চেষ্টা চালানোর পরও ফিলিস্তিন, গাজা, রোহিঙ্গা সমস্যা, লিবিয়া ও সোমালিয়ার দিকে মনেযোগ দেয়ার আহবান জানিয়েছি। বেশ কিছুদিন থেকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘে নিরাপত্তা পরিষদে মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছেন। কুয়ালালামপুর সম্মেলনে এই দিকটি তিনি তুলে ধরেন।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন পাকিস্তান এখন কাশ্মীর ইস্যুতে এই ফোরামটিকে ব্যবহার করার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানের এই নীতির ব্যাপারে চীনের সমর্থন আছে বলে ধারনা করা হচ্ছে। ইরান ও তুরস্কের সাথে চীনের সর্ম্পক ঘনিষ্ট হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে পাকিস্তানের মতো পুরানো মিত্রকে কেন দূরে ঠেলে দিচ্ছে সৌদি আরব। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভারতের সাথে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের ঘনিষ্ট সর্ম্পকের প্রভাব পড়ছে কাশ্মীর ইস্যুতে। আসুন আমরা জেনে নেই সৌদি আরব ও আমিরাতের সাথে ভারতের সর্ম্পক কেমন।

সৌদি আরবে মোহাম্মদ বিন সালমান ক্রাউন প্রিন্স হিসাবে দায়িত্ব গ্রহনের পর নীরবে সৌদি আরবের সাথে ভারতের ঘনিষ্টতা বাড়ছে। ২০১৯ সালের অক্টোবরে ভারতের প্রধানমন্দ্রী নরেন্দ্র মোদির সৌদি আরব সফরে ভারত-সৌদি স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ কাউন্সিল গঠন করা হয়। মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন-২০৩০ কর্মসূচিতে বিশ্বের যে আটটি দেশের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে, তারও অন্যতম হচ্ছে ভারত। আবার মধ্যপ্রাচ্যে ভারতের প্রভাব বাড়ানোর নানা চেষ্টা করছে সংযুক্ত আরব আমিরাত।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে আবুাধিবেতে বর্নাঢ্য অনুষ্টানে অর্ডার অব জায়েদ পদকে ভুষিত করা হয়। আমিরাতের যুবরাজ ও ডেপুটি ডিফেন্স মিনিস্টার মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান মোদিকে ভাই ডেকে তাকে সোনার মেডেলটি পড়িয়ে দেন।

আরব আমিরাত সফর শেষ করে মোদি বাহরাইন সফর করেন। ভারতের সরকার প্রধান হিসাবে মোদি প্রথম বাহরাইন সফর করেন। বাহরাইনের বাদশাহ হামাদ বিন ইসা আল খলিফা মোদিকে কিং হামাদ অর্ডার অব দ্য রেনেসা পদকে ভূষিত করেন। এর আগে ২০১৬ সালে সৌদি আরবের সর্ব্বো” বেসামরিক সম্মাননা কিং আব্দুল আজিজ পদক দেয়া হয় নরেন্দ্র মোদিকে।

কাশ্মীরের সাংবিধানিক অধিকার হরন করার পর ভারতের অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নেয় আরব আমিরাত। দিল্লিতে নিযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত বলেন কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা হরন ভারতের আভ্যন্তরিন বিষয়। অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ভারতকে আরো সক্রিয় দেখতে চায় ইসরাইল। অপরদিকে আরব দেশগুলোতে ইসরাইলের সাথে পরোক্ষ কূটনৈতিক সর্ম্পক বজায় রেখে চলছে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন।

ওআইসির ফোরামে কাশ্মীর নিয়ে আলোচনায় সৌদি আরবের অনাগ্রহের মুলে কাজ করছে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের নীতি। সৌদি-আমিরাতি এই নীতির কারনে পাকিস্তান তার অবস্থান বদল করতে বাধ্য হচ্ছে। সৌদি আরবের শত্রু দেশ হিসাবে পরিচিত ইরান ও তুরস্কের সাথে ইসলামাবাদের সর্ম্পক ঘনিষ্ট হচ্ছে।

0 Shares