কুকুরের দুধ খেয়ে বড় হওয়া ফখরার বিস্ময়কর জীবনযাপন!

117 Shares

জন্মের ৬ মাসের মাথায় মাকে তালাক দেয় বাবা। অভাবী সংসারের ঘানি টানতে মধুপুর শহরের হাটবাজারে ময়লা আবর্জনা সাফের কাজ নেয় মা। হাটের অপরিচ্ছন্ন সরু রাস্তার ধারে অনাদরে বসিয়ে রাখতো মাসুম ফখরাকে। ক্ষুধায় কাঁদলে হাতের কাজ ফেলে পান করাতেন বুকের দুধ। ক’দিন পর খেয়াল করেন অনাদরে পড়ে থাকা ফখরার বেজায় ভাব বেওয়ারিশ কুকুরের সাথে। একদিন মা দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। অবাক কাণ্ড দেখে হতবাকও হয়ে যায়। হাটের আবর্জনার স্তূপের আড়ালে দুই ছানার সাথে কুকুরের স্তন চুষছে ফখরা। নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনি মা। টেনে-হিঁচড়ে সরিয়ে নিয়ে যায় তাকে।

এরপর রাস্তার উপর বসিয়ে রাখা ফখরাকে কাজের সময়েও কড়া নজরে রাখতো মা। কিন্তু সুযোগ পেলেই দল বাধা নেড়ি কুকুর ছুটে আসতো। আর ফখরা নির্ভয়ে পান করতো কুকুরের স্তন। রাগে-ক্ষো’ভে প্রায়ই মা’রতো ফখরাকে। একদিন ফখরা হারিয়ে যায়। টানা ২ দিন পর পাওয়া যায় মধুপুর পৌরশহরের সান্দার পট্টির জঙ্গলে। সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায়। এভাবেই কুকুরের সাথে বাড়-বাড়ন্তের গল্প ফখরার। পৌর শহরের সব কুকুর এখন ওর খেলার সাথী। বিশ্বস্ত বন্ধু। আসলে কুকুরের দুধ পান করেই বড় হয়ে উঠেছে ফখরা। এভাবেই ফখরার জীবনযাপনের আক্ষরিক বর্ণনা দিয়েছেন তার মা জমেলা বেগম।

ফখরার বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর পৌরসভার কাজী পাড়ায়। বাবার নাম আলীম উদ্দীন। বাড়ী মধুপুর উপজেলার জটাবাড়ী। কিন্তু ফখরার খোঁজ নেন না কখনো। ফখরার জন্ম ২০১১ সালে। বসবাস মামার বাড়ী কাজীপাড়ায়। ফখরার এক মামা সবুজ মিয়া জানান, দেড় বছর বয়স থেকে কুকুরের সাথে হাঁটাচলা, মেলামেশা অবিশ্বাস্য সখ্যতায় রূপ নেয়। দিনরাত পথচলা, আহার-বিহার ও নিশিযাপনে তৈরি হয় অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। পাড়ার সব বেওয়ারিশ কুকুরের সাথে ভাব হলেও আদুরী আর বাবুলি তার সর্বক্ষণের সাথী। ওদের নিয়ে মধুপুর পৌরশহর ছাড়াও গাঙ্গাইর, রক্তিপাড়া, আশ্রা, মোটের বাজার, গারো বাজারসহ উপজেলার হাটবাজার ও গঞ্জ চষে বেড়ায় ফখরা। দুরের রাস্তায় কুকুরের পিঠে পাড়ি দেয়। যেন ঘোড়সওয়ার। বন্ধুর মতো গড়াগড়ি, গলাগলি, কামড়া-কামড়ি ও কসরত দেখিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করে। তখন ৫/১০ টাকা বখশিশ মেলে। তাতেই কেনা হয় কলা-পাউরুটি। ভাগাভাগি করে খাওয়া। এভাবেই কলা আর পাউরুটিতে দিন কাটে সবান্ধব ফখরার।

অনেক সময় খাবারের লোভে মধুপুর পৌর শহরের দল বাঁধা কুকুর পিছু নেয় ফখরার। আর শহরে নবাগত অতিথি কুকুরের সাথে ভাব জমাতে সময় লাগেনা তার। মহল্লায় নবাগত আর মনিব অনুগত দু‘দল কুকুরের আবহমান ঝগড়ায় দাঁত খিঁচিয়ে সেই গালি- “কেন আইলি” প্রত্যুত্তরে “যাইস-খাইস”; বি’বাদ মেটাতে তৎপর থাকে ফখরা। ডজনখানেক ‘যাইস-খাইস’ বন্ধু নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সময় শহরবাসী কেউ কেউ কু’ত্তার বাচ্চা তুলে গালি দেয় ফখরাকে। তা গায়ে মাখে না ফখরা। দিনাবসানে মধুপুর বাসস্ট্যান্ডের ফুটপাতে কুকুরের সাথে কুণ্ডলী পাকিয়ে আরাম আয়েশে সময় কাটায় এই বিস্ময় বালক। মা জমেলা ছেলেকে অনেক বুঝিয়েছেন। লাভ হয়নি। কুকুর না দেখলে অস্থির হয়ে পড়ে। খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়। তাই ওকে ওর মতো করে ছেড়ে দিয়েছেন।

মধুপুর বাসস্ট্যান্ডের পরিবহন শ্রমিক নির্মল জানান, রাতে এক ডজন কুকুরের কড়া পাহারায় বাড়ি ফেরে ফখরা। কাক ডাকা ভোরে দলবেঁধে ফিরে বাসস্ট্যান্ডে। ফখরার ৩ বোনের সবার বিয়ে হয়েছে। বড় বোন শাহেদার আ’ক্ষেপ, কুকুরের সাথে থাকা-খাওয়ায় পড়শিরা বির’ক্ত। ঘৃ’ণা করে। বকাঝকা দেয়। কেউ মেশেনা। এমনকি আত্মীয় স্বজনরা বাড়িতে আসেনা। কিন্তু ফখরার ওসবে তোয়াক্কা নেই।

ফখরার মামাতো ভাই নজরুল জানায়, আবাল্য মেশামেশিতে অবুঝ প্রাণীর সাথে ফখরার এখন নাড়ির বন্ধন। বোবা প্রাণী ওর আপনজন। ওদের ভাষাও বুঝে সে। আকার ইঙ্গিতে ভাব বিনিময় করে। বড় বোন শাহেদা আরো জানান, বাড়িতে ফিরলে কুকুরের সাথে একসাথে তাকে খাবার দিতে হয়। না দিলেই অঝোর ধারায় কাঁদে ফখরা। বেশি খেপলে হাঁড়ি-পাতিল ভাঙে। অ’স্বাভাবিক আচরণ করে। তখন ভয় লাগে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে মধুপুর পৌরশহরে বেওয়ারিশ কুকুর নিধ’ন নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড বাধায় ফখরা। প্রিয় সহকর্মী কালু ও ভুলু নিধ’ন হয় অভিযানে। এতে ক্ষে’পে যায় ফখরা। বাড়িতে অ’স্বাভাবিক চেঁচামেচি শুরু করে। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। পরে একদল কুকুর নিয়ে পৌর ভবনে মেয়র মাসুদ পারভেজের সাথে সাক্ষাৎ করে। মেয়রকে জানায়, বন্ধু কালু আর ভুলু কখনো মানুষ কামড়াত না। তাহলে কেন তাদের নিধ’ন করা হলো। মেয়র আগে থেকেই ফখরাকে চেনেন। তাই আদর-সোহাগে বুঝিয়ে শান্ত করেন তাকে।

ফখরা জানায়, মেয়র তাকে খুব আদর করেন। তাকে কথা দিয়েছেন। তার বন্ধুদের আর নিধ’ন করা হবেনা। এজন্য সে খুবই খুশি। এ ব্যাপারে মেয়র মাসুদ পারভেজ জানান, ফখরার কুকুর প্রীতির খবর তিনি জানেন। এটি একটি অবাক কাণ্ড।

পৌর শহরের পাইলট মার্কেটের দোকানি রফিকুল ইসলাম তালুকদার জানান, ফখরাকে ছোটকাল থেকেই কুকুরের সাথে বড় হতে দেখেছি। কুকুরের দুধ পান করার দৃশ্য অনেকেই দেখেছেন।

মধুপুর পাইলট মার্কেটের গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ভুট্টো সরকার বলেন, আজন্ম কুকুরের সাথে মিতালির দরুণ কখনো কখনো ওর মধ্যে অ’সহিষ্ণু ও ক্ষি’প্ত আচরণ দেখা যায়। রাগলে গলা দিয়ে অ’স্বাভাবিক স্বর বের হয়। সর্বক্ষণ জিহ্বা বের করে রাখতে পছন্দ। হাঁটা ও পা ফেলার ধরণে কুকুরের অনুকরণ লক্ষ্যণীয়। চোখের নির্বিকার চাহনিতে শ’ত্রুতা দৃশ্যমান। খুবই ছটফটে ও দুরন্ত স্বভাবের। কোথাও একদণ্ড স্থায়ী হতে চায়না। অনেক সময় মুখ দিয়ে লালা ঝরে।

মধুপুর থানার ওসি তারিক কামাল ফখরার কুকর প্রীতির এ অ’বিশ্বাস্য ঘটনার বিবরণ দিয়ে ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, সৃষ্টিকর্তা মানুষকে কতভাবে রাখেন ফখরা তার জীবন্ত দৃষ্টান্ত।

ফখরার জেঠাতো বোন খাদিজা জানান, ওর কুকুরসঙ্গ বির’ত রাখা বিফলে গেছে। ওর জরুরী চিকিৎসা দরকার। পাড়া-পড়শিরা ফখরাকে ঘৃ’ণা করে। তাই কেউ কোনো সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসেনা। মানুষে-কুকুরে এ মিতালি বিস্ময়কর না হলেও স্বভাবে হিং’স্র ও মানসিক বৈ’কল্যে আক্রা’ন্ত ফখরার সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনে হৃদয়বানদের এগিয়ে আসার আর্তি জানান খাদিজা।

এ ব্যাপারে সাবেক সিভিল সার্জন এবং মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শামসুল হক জানান, বয়সের তুলনায় ফখরা আকারে ছোট হওয়ার কারণ সে সম্পূর্ণ সুস্থ নয়। কুকুরের সাথে অ’স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করায় এবং বেড়ে ওঠায় নানা রোগব্যাধি তার শরীরে বাসা বাধা স্বাভাবিক। মুখ দিয়ে লালা ঝরার ঘটনা থেকে এটি সহজেই অনুমান করা যায়। তাকে জরুরী ভিত্তিতে চিকিৎসা করানো দরকার।
ইত্তেফাক

117 Shares