এখনও ঊর্ধ্বগতিতে করোনা, আগামী সপ্তাহে আরও বাড়বে সংক্রমণ

0 Shares

মার্চ থেকে আগস্ট। আঙুলে গুনলে এক এক করে ৬টি মাস। এই সময়ে মহামারি করোনা ভাইরাসের গভীর ও কঠিন অভিঘাত মাথায় নিয়ে চলছে দেশ। এর শেষ কোথায়, কখন- তা এখনও অজানা। ইতোমধ্যে সরকারি হিসাবে দেশে করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় পৌনে ৩ লাখে পৌঁছেছে, মৃত্যু ছাড়িয়েছে সাড়ে ৩ হাজার।

দেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে চারপাশে নানারকম মন্তব্য, মূল্যায়ণ চলছে। সরকারি পর্যায় থেকে দেয়া হচ্ছে একরকম তথ্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে আরেকরকম কথা, আবার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার রিপোর্টে জানা যাচ্ছে ভিন্ন কিছু। বক্তব্য ও তথ্যের এই ভিন্নতায় প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা কিছুতেই লাঘব হচ্ছে না। যদিও স্বাস্থ্যঝুঁকি জেনেও বাধ্য হয়ে জীবনের তাগিদে ক্রমে কর্মে নামতে হচ্ছে মানুষকে।

তবে বাংলাদেশে গত প্রায় ৬ মাস ধরে চলা করোনা মহামারির বর্তমান অবস্থান কী? সংক্রমণ কি কমছে নাকি বাড়ছে, মৃত্যু কিছু নিম্নমুখি নাকি ঊধ্বমুখি?

গেল শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিদিন আক্রান্ত হওয়া নতুন রোগীর তালিকায় বাংলাদেশকে নিয়ে যে তথ্য দিয়েছে তা সত্যিই বড় দুশ্চিন্তার। সংস্থটির জরিপে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বে নতুন রোগী বাড়ার তালিকাতে বর্তমানে ৫ নম্বরে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। অর্থাৎ বর্তমানে ভারত, মেক্সিকো, ফিলিপাইন ও রাশিয়ার পরেই অধিক আক্রান্ত দেশের তালিকায় আছে বাংলাদেশের নাম।

এ বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে রোগী শনাক্তের ষষ্ঠ মাসে এসেও করোনার ঊধ্বমুখী হার এখনও চলমান। আর এসবের জন্য সঠিকভাবে স্বাস্থ্যবিধি না মানা, কিছু জেলা লকডাউনসহ ঢাকার ভেতলে ক্লাস্টার ভিত্তিতে লকডাউন, কোরবানির ঈদে পশুর হাট, রাজধানী ছেড়ে গ্রামে যাতায়াতসহ করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকারের পর্যাপ্ত কার্যক্রম না থাকাকেই দায়ী করছেন তারা।

আগামী সপ্তাহ অর্থাৎ ২০ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে আক্রান্তের হার আরও বাড়বে এবং তার পরের সপ্তাহ অর্থাৎ ২৫ আগস্ট থেকে বাড়বে মৃত্যুর হার- এমনই বলছেন জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা।

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সদস্য ও বঙ্গবন্ধু শেষ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা, করোনা টেস্টের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি, টেস্ট করাতে গিয়ে ভোগান্তিসহ নানা কারণে দেশে টেস্টের সংখ্যা কমেছিল। কিছু কিছু জায়গায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির কারণে গত সপ্তাহ থেকে আবার টেস্টের সংখ্যা বেড়েছে। তবে টেস্টের সংখ্যা বাড়ুক আর কমুক, সংক্রমণের হার একই ছিল। বরং কম টেস্টেও রোগী শনাক্তের হার বেশি ছিল।’

‘বাংলাদেশে সংক্রমণের হার ঊধ্বগতিতেই রয়েছে’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আর এক সপ্তাহ পরে করোনার সংক্রমণের হার আরও ঊর্ধ্বগতি আমরা দেখতে পাবো। সেটা হবে ঈদের ছুটির সময়ে যাতায়াতের কারণে এবং কোরবানির পশুর হাটে জনসমাগমের কারণে।’

দেশে সংক্রণের ঊর্ধ্বগতি এখনও অব্যাহত থাকা প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলছেন, ‘ঈদের কারণে চলাচল বেড়েছিল। তাতে বিভিন্ন কমিউনিটিতে যদি সংক্রমণ হয় সেটা কতটুকু ছড়ায় তার ওপর ভিত্তি করে বলা যাবে পরবর্তীতে কী অবস্থা ঘটতে যাচ্ছে। রোগী শনাক্ত এখনও সেভাবে অতটা বাড়েনি, কিন্তু শিগগিরই সেটা প্রচুর বাড়তে পারে- এটা আগামী সপ্তাহের মধ্যে বোঝা যাবে। এছাড়া সরকার নতুন করে এমন কোনও কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি যে সংক্রমণ কমবে। তাহলে কমবে কীভাবে?’

কোনও একটা দেশে সংক্রমণ প্রতিরোধে সরকারের যে কর্মকৌশল সেটা কী হতে যাচ্ছে তার ওপর নির্ভর করবে সংক্রমণের ঢেউ কী রকম হবে- এমন মন্তব্য করে ডা. বেনজির বলেন, ‘সেটা সেকেন্ড ওয়েব নাকি এই ওয়েব কন্টিনিউ করেই এগোতে থাকবে তার জন্য আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক গত এক সপ্তাহে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আগের তুলনায় বাড়ছে জানিয়ে বলেন, ‘এই রোগী বাড়াটা ঈদের আগে যারা অসুস্থ ছিলেন তাদের হার। কিন্তু ঈদের সময়ের সংখ্যা দেখা যাবে আরও এক সপ্তাহ পর থেকে। আর দেশে ধীরে ধীরে হলেও সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী।’

এদিকে সব শঙ্কা উড়িয়ে সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জাহিদ মালেক বলছেন ভিন্ন কথা। গতকাল শনিবার এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে বিদায় নেয়ার পথে করোনা, আক্রান্ত বিবেচনায় দেশে করোনায় মৃত্যুহারও অনেক কম। তাই ভ্যাকসিন ছাড়াই দেশ এখন স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার পথে। এই স্বাভাবিক অবস্থার কারণেই দেশের অর্থনীতির চাকা আবার সচল হয়েছে।’

বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যুর খবর দেয় আইইডিসিআর। মূলত এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সারা দেশে ব্যাপক হারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে দেশে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২ লাখ ৭৪ হাজার ৫২৫ জন। মারা গেছেন ৩ হাজার ৬২৫ জন আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩৫ জন।

0 Shares